অস্ত্র মামলার বাদী জানেন না তদন্তের ফল!
চার আসামির একজন চার্জশিটে, জোর করে সাক্ষীর স্বাক্ষর নেওয়ার দাবী
কক্সবাজারের মহেশখালী থানায় কোস্টগার্ডের দায়ের করা একটি অস্ত্র মামলার তদন্ত ও অভিযোগপত্র দাখিল নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। এজাহারে একই ঘটনায় চারজনকে আটক এবং অস্ত্র উদ্ধারের কথা উল্লেখ করে মামলা করা হলেও তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে মাত্র একজনের বিরুদ্ধে। বাদ পড়েছেন অপর তিন আসামি। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, মামলার বাদী গোলাম রব্বানী নিজেই বলেছেন, পুলিশ তদন্তে কী করছে, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।
অন্যদিকে, মামলার জব্দ তালিকার দুই সাক্ষী দাবি করেছেন, তাঁরা অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেননি এবং তাঁদের জোর করে স্বাক্ষর করানো হয়েছে। বাদীর তদন্তের ফলাফল সম্পর্কে অজ্ঞতার বক্তব্য, সাক্ষীদের অভিযোগ এবং এজাহার ও চার্জশিটের মধ্যে পার্থক্য সব মিলিয়ে মামলাটির তদন্তপ্রক্রিয়া নিয়ে জনমনে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, যে ঘটনায় কোস্টগার্ড চারজনকে আটক করে অস্ত্র উদ্ধারের কথা উল্লেখ করে মামলা করল, সেই একই ঘটনায় তদন্ত শেষে তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেল না কেন? আর মামলার বাদীই যদি তদন্তের ফলাফল না জানেন, তাহলে মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করা হয়েছিল কি না?
বাদীর বক্তব্য: ‘পুলিশে কী করছে, সে বিষয়ে আমি কিছু জানি না’
মামলাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে বাদী গোলাম রব্বানীর বক্তব্য। তিনি কোস্টগার্ডের এলএস (সহকারী সিসি) হিসেবে মামলাটি দায়ের করেন। এজাহারভুক্ত চার আসামির মধ্যে তিনজনকে তদন্ত শেষে বাদ দেওয়ার কারণ জানতে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমরা বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকি, পুলিশে কী করছে সে বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমি একটা মিটিংয়ে আছি, আমি ফ্রি হয়ে বিস্তারিত জেনে আপনাকে কল দিব।
বাদীর এ বক্তব্য নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একটি অস্ত্র মামলায় অভিযানের বিবরণ, আটক ব্যক্তিদের পরিচয় এবং অস্ত্র উদ্ধারের তথ্য দিয়ে মামলা দায়ের করা হলো, অথচ তদন্ত শেষে তিন আসামি বাদ পড়ার পরও বাদী তদন্তের ফলাফল সম্পর্কে অবগত নন বলে জানালেন।
তবে বাদী তদন্তের বিষয়ে কেন অবগত ছিলেন না, তদন্তের অগ্রগতি তাঁকে জানানো হয়েছিল কি না এবং পরে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দিয়েছেন কি না এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি।
মামলার নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের গত ৭ সেপ্টেম্বর রাতে মহেশখালী থানাধীন ধলঘাটা ইউনিয়নের উত্তর মহুরীঘোনা এলাকায় কোস্টগার্ড অভিযান পরিচালনা করে। এজাহারে মো. আলমগীর (৩৪), মো. তৌহিদুল ইসলাম (২৪), কাইয়ুম উদ্দিন (৩৫) ও ফারুক (২৫) এই চারজনকে আটক করার কথা উল্লেখ রয়েছে।
এজাহারে দেশীয় তৈরি আগ্নেয়াস্ত্র (এলজি), কার্তুজ, দা ও অন্যান্য আলামত উদ্ধারের বিবরণ দিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা করা হয়। মামলাটি জিআর-১৩৭/২৬ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।
পরে মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় মাতারবাড়ী পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ সাব-ইন্সপেক্টর মো. মোজাহারুল ইসলামের ওপর। তদন্ত শেষে তিনি আদালতে শুধু মো. আলমগীরের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অপর তিন আসামি তৌহিদুল ইসলাম, কাইয়ুম উদ্দিন ও ফারুককে অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়া হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের মতো পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু এজাহারে চারজনকে একই অভিযানের ঘটনায় আটক দেখানো এবং অস্ত্র উদ্ধারের বিবরণ থাকার পর তদন্তে তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ার কারণ কী সেই ব্যাখ্যাই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মামলায় কোস্টগার্ডের প্রস্তুত করা জব্দ তালিকায় সাক্ষী হিসেবে উল্লেখিত মো. করিম উদ্দিন ও মো. রেজাউল করিমের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেন দৈনিক কক্সবাজার সংবাদের প্রতিবেদক।
তাঁরা দাবি করেন, কোস্টগার্ড কোথা থেকে অস্ত্র উদ্ধার করেছে, তা তাঁরা নিজের চোখে দেখেননি। তাঁদের মতে, জোর করে তাঁদের স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। তাঁরা আরও দাবি করেন, চারজনকে বাজারের একটি চায়ের দোকান থেকে আটক করা হয়েছিল। পরে আলমগীরের ঘর থেকে অস্ত্র উদ্ধারের কথা দেখানো হয়।
সাক্ষীদের এসব দাবি সত্য হলে, অস্ত্র উদ্ধারের স্থান, জব্দ তালিকা প্রস্তুত এবং সাক্ষ্য গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে তাঁদের বক্তব্যের সত্যতা সংশ্লিষ্ট নথি, অন্যান্য সাক্ষ্য এবং কোস্টগার্ডের বক্তব্যের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
তিন আসামিকে অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্তকারী কর্মকর্তা সাব-ইন্সপেক্টর মো. মোজাহারুল ইসলাম বলেন, আমি তদন্ত করে যার বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়েছি তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দিছি। আর যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাইনি তাদেরকে বাদ দিছি। এর চেয়ে বেশি কিছু জানতে চাইলে ওসি স্যারের সঙ্গে কথা বলুন।
মহেশখালী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আব্দুস সুলতান বলেন, তদন্ত করে যার বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। আর যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যায়নি তাদেরকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর চেয়ে বেশি কিছু জানতে চাইলে তদন্তকারী অফিসারের সঙ্গে কথা বলুন।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, তদন্তে প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। তবে বাদীর বক্তব্য, জব্দ তালিকার সাক্ষীদের দাবি এবং এজাহার ও অভিযোগপত্রের পার্থক্য নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
বাদীর অজ্ঞতা, সাক্ষীদের অভিযোগ জবাব দেবে কে? :
মামলাটিতে এখন কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি। বাদী গোলাম রব্বানী তদন্তের ফলাফল সম্পর্কে অবগত না থাকলে তাঁকে তদন্তের অগ্রগতি ও অভিযোগপত্রের বিষয়ে জানানো হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে জব্দ তালিকার দুই সাক্ষীর অভিযোগও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা দরকার।
এজাহারে চারজনকে আটক এবং অস্ত্র উদ্ধারের যে বিবরণ দেওয়া হয়েছে, তদন্তে তার কোন অংশ সমর্থিত হয়েছে এবং কোন অংশের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি সেটিও নথিভিত্তিক ব্যাখ্যার দাবি রাখে।
একদিকে কোস্টগার্ডের এজাহারে চার আসামি, অন্যদিকে পুলিশের চার্জশিটে মাত্র একজন, এর মধ্যে বাদী বলছেন, তদন্তে কী হয়েছে তা তিনি জানেন না। এই পরিস্থিতিতে মামলাটির তদন্তপ্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর স্বচ্ছ ও তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
তবে তিন আসামিকে অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়া নিজে থেকেই তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ নয়। অভিযোগের সত্যতা, তদন্তের যথার্থতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন নথি ও সাক্ষ্য-প্রমাণের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন। জনস্বার্থে এ মামলার প্রতিটি অসংগতি যথাযথভাবে যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।