এক্সক্লুসিভ

কোস্টগার্ড কর্তৃক অস্ত্রসহ আটক ৪ জনের মধ্যে ৩ জন বাদ পুলিশের চার্জশিটে!

পুলিশের তদন্ত নিয়ে জনমনে প্রশ্ন

  • মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়, মনগড়া তদন্তের অভিযোগ সচেতন মহলের, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি।

কক্সবাজারের মহেশখালীতে কোস্টগার্ডের দায়ের করা একটি অস্ত্র মামলার তদন্ত ও অভিযোগপত্র (চার্জশিট) নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কোস্টগার্ডের এজাহারে অস্ত্রসহ চারজনকে আটকের কথা উল্লেখ থাকলেও তদন্ত শেষে তাঁদের মধ্যে মাত্র একজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে পুলিশ। বাদ পড়েছেন বাকি তিনজন। এ ঘটনায় তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি তদন্তকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে মনগড়া তদন্তের অভিযোগ তুলেছেন সচেতন মহলের কেউ কেউ।

তবে মামলার এজাহার ও অভিযোগপত্রের মধ্যে এমন পার্থক্য নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা চলছে। একই অভিযানে চারজনকে আটক করে অস্ত্র উদ্ধারের কথা এজাহারে উল্লেখ করার পর তদন্ত শেষে তিনজনকে অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়া হলো কেন?এ প্রশ্নের উত্তর চাইছেন সচেতন নাগরিকেরা।

কোস্টগার্ডের অভিযানে আটক ৪জন :
মামলার নথি অনুযায়ী, মহেশখালীর মাতারবাড়ী এলাকার কোস্টগার্ডের সহকারী সিসি এলএস গোলাম রাব্বানী বাদী হয়ে ৮ মে ২০২৬ তারিখে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা দায়ের করেন। মহেশখালী থানার মামলা নম্বর ১৮/১৩৭, তারিখ ৮ মে ২০২৬। এজাহারভুক্ত চার আসামি হলেন মো. আলমগীর (৩৪), মো. তৌহিদুল ইসলাম (২৪), কাইয়ুম উদ্দিন (৩৫) ও ফারুক (২৫)।

এজাহারে উল্লেখ করা হয়, কোস্টগার্ডের অভিযানে দেশীয় তৈরি আগ্নেয়াস্ত্র (এলজি), কার্তুজ, দাসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ও আলামত উদ্ধার করা হয়। একই ঘটনায় চারজনকে আটক করে তাঁদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা দায়ের করা হয়।

তদন্ত শেষে অভিযোগপত্রে একজন :
মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয় মাতারবাড়ী পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মোজাহারুল ইসলামের ওপর। তদন্ত শেষে তিনি ৩১ জুলাই ২০২৬ তারিখে ২০৮ নম্বর অভিযোগপত্র দাখিল করেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

অভিযোগপত্রে শুধু মো. আলমগীরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অন্য তিন এজাহারভুক্ত আসামি মো. তৌহিদুল ইসলাম, কাইয়ুম উদ্দিন ও ফারুককে বাদ দেওয়া হয়েছে।

তদন্তকারী কর্মকর্তার প্রতিবেদনে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের মতো পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাদ পড়া তিন আসামিকে নিয়ে প্রশ্ন :
একই অভিযানে চারজনকে আটক এবং অস্ত্র উদ্ধারের কথা এজাহারে উল্লেখ থাকার পর তদন্ত শেষে তিনজনকে অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের কেউ কেউ।

তাঁদের প্রশ্ন, বাদ পড়া তিন আসামি যদি ঘটনার সঙ্গে জড়িত না থাকেন, তাহলে কোস্টগার্ডের এজাহারে তাঁদের আটকের কথা এবং তাঁদের সঙ্গে অস্ত্র উদ্ধারের বিবরণ কীভাবে এসেছে? অন্যদিকে, তদন্তে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সমর্থনে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া না গেলে তার ভিত্তি কী ছিল, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

এজাহারে বর্ণিত আটক ও অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা তদন্তের সময় কীভাবে যাচাই করা হয়েছে, জব্দতালিকা ও সাক্ষীদের বক্তব্য কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং প্রত্যেক আসামির সংশ্লিষ্টতা নিরূপণে কী ধরনের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে এসব বিষয় সামনে আসা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।

তদন্তে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ :
সচেতন মহলের কয়েকজনের অভিযোগ, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে প্রভাবিত হয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা মনগড়াভাবে তদন্ত করে অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন। তাঁদের দাবি, অভিযোগপত্র থেকে তিনজনকে বাদ দেওয়ার কারণ এবং তদন্তের প্রতিটি ধাপের যৌক্তিকতা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা হোক।

সচেতন মহলের দাবি, তদন্তে কোনো অনিয়ম বা আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে অভিযোগপত্র থেকে তিন আসামিকে বাদ দেওয়ার পেছনে কী তথ্য-প্রমাণ ও যুক্তি কাজ করেছে, তা স্পষ্ট করা হোক।

অভিযোগপত্র থেকে তিনজনকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. মোজাহারুল ইসলাম বলেন, “আমি তদন্ত করে যার বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়েছি, তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দিছি। আর যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাইনি, তাদেরকে বাদ দিছি। এর চেয়ে বেশি কিছু জানতে চাইলে ওসি স্যারের সঙ্গে কথা বলুন।”

এ বিষয়ে মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুস সুলতান বলেন, “তদন্ত করে যার বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে, তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। আর যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যায়নি, তাদেরকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর চেয়ে বেশি কিছু জানতে চাইলে তদন্তকারী অফিসারের সঙ্গে কথা বলুন।”

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি :
একটি অস্ত্র মামলায় চারজনকে আটকের তথ্য এজাহারে থাকার পর অভিযোগপত্রে মাত্র একজনকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকেরা। তাঁদের মতে, এজাহার, জব্দতালিকা, সাক্ষীদের জবানবন্দি ও তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য পাশাপাশি পর্যালোচনা করা হলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার হতে পারে।

ক্যাটাগরি