আজ মহাসপ্তমী, পূজামণ্ডপে মন্ত্রোচ্চারণ আর ঢাকের বাদ্য
ষষ্ঠীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের আনুষ্ঠানিকতা শেষে আজ শনিবার উদ্যাপিত হচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন মহাসপ্তমী। ঢাক-ঢোল, কাঁসর, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি ও মন্ত্রোচ্চারণে মুখর দেশের পূজামণ্ডপগুলো। দেবীর কাছে ভক্তদের প্রার্থনা—শান্তি, সংহতি, শক্তি ও বিশ্বকল্যাণ।
মহাসপ্তমীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আচার নবপত্রিকা বা ‘কলাবউ’ স্থাপন। কলাগাছের সঙ্গে কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু ও ধানগাছ একত্রে বেঁধে স্নান করানোর পর নতুন শাড়ি পরিয়ে মণ্ডপে স্থাপন করা হয়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই নয়টি উদ্ভিদ দেবীর নয়টি শক্তির প্রতীক।
নবপত্রিকার এ আচার প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্ক এবং কৃষি ও জীবনে উদ্ভিদের গুরুত্ব তুলে ধরে। এর মাধ্যমে প্রকৃতি সংরক্ষণ ও পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার বার্তাও পাওয়া যায়।
মহাসপ্তমীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আচার দেবীর মহাস্নান। দর্পণে দেবীমূর্তির প্রতিবিম্ব রেখে গঙ্গাজল, দুধ, মধু ও সুগন্ধি উপাচারের মাধ্যমে এ আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। এটি বাহ্যিক ও আত্মিক শুদ্ধতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। একই সঙ্গে অন্যের অধিকার রক্ষা, বৈষম্য ও হিংসা পরিহার এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে নৈতিক মূল্যবোধ চর্চার গুরুত্বও স্মরণ করিয়ে দেয়।
পৌরাণিক কাহিনিতে মহিষাসুর বধের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার বিজয় শুভ ও অশুভ শক্তির চিরন্তন সংঘাতকে তুলে ধরে। দেবীর দশ হাত ও বিভিন্ন অস্ত্র অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতীক। তাঁর সঙ্গে থাকা লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ যথাক্রমে সমৃদ্ধি, জ্ঞান, বীরত্ব ও বুদ্ধির প্রতিনিধিত্ব করেন।
বাঙালির সংস্কৃতিতে দুর্গাপূজা কেবল দেবী আরাধনার উৎসব নয়, পিতৃগৃহে কন্যার ফিরে আসার আবেগের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। পাশাপাশি প্রতিমাশিল্পী, মৃৎশিল্পী, ঢাকি, আলোকসজ্জাকর্মী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের শ্রমে এ উৎসবের সঙ্গে যুক্ত হয় বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক আয়োজন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মহাসপ্তমীর অন্যতম বার্তা হলো ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। প্রতিটি মানুষ যেন নির্ভয়ে নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারেন, সেটিই হওয়া উচিত উৎসবের মূল চেতনা। ঢাকের বাদ্য থেমে গেলেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, প্রকৃতির যত্ন নেওয়া এবং মানুষের প্রতি সহমর্মিতা বজায় রাখার শিক্ষা যেন সবার মধ্যে জাগ্রত থাকে—মহাসপ্তমীর তাৎপর্য সেখানেই।