প্রথম ধাপে ৮শ’ ইউপিতে ভোট, প্রভাব বিস্তার ও বিশৃঙ্খলায় তাৎক্ষণিক শাস্তির বিধান
দেশের প্রায় ৪ হাজার ৩০০ ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) পাঁচ ধাপে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ২১ জানুয়ারি প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হবে এ নির্বাচনী প্রক্রিয়া। পাঁচ ধাপের শেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে একই বছরের ২৭ মে।
তবে এবারের ইউপি নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার, পেশিশক্তির ব্যবহার, ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা নির্বাচনী পরিবেশ বিঘ্নিত করার চেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে কমিশন। অপরাধের ধরন ও প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলও হতে পারে। নির্বাচনী অনিয়মের কারণে প্রয়োজন হলে কোনো কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বাতিল করে পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতাও রয়েছে কমিশনের।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, শুধু ভোটগ্রহণ সম্পন্ন করাই নয়, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বিতভাবে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। নির্বাচনী অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি বিধিমালা কার্যকরভাবে প্রয়োগের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে কমিশন।
পাঁচ ধাপে ভোট, প্রথম ধাপ ২১ জানুয়ারি
ইসির ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ২১ জানুয়ারি প্রথম ধাপ, ৪ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় ধাপ, ২৯ এপ্রিল তৃতীয় ধাপ, ১৩ মে চতুর্থ ধাপ এবং ২৭ মে পঞ্চম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
কমিশন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আনুমানিক ৪ হাজার ৩০০ ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে। আইন অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে ইসি।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবেন সংশ্লিষ্ট জেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা। সাধারণত ভোটগ্রহণের প্রায় ৪২ থেকে ৪৫ দিন আগে তফসিল ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে।
ধাপভিত্তিক নির্বাচনী এলাকা নির্ধারণের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। প্রথমে জেলা সদরসংলগ্ন এবং পরে উপজেলা সদরের কাছাকাছি ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সমন্বিতভাবে মোতায়েন করা সহজ হবে। প্রয়োজন হলে পার্শ্ববর্তী জেলা থেকেও অতিরিক্ত বাহিনী আনা যাবে।
‘ভালো নির্বাচন করাই আমাদের লক্ষ্য’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মানদণ্ড অনুসরণ করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও গ্রহণযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ।
তিনি বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের যে মানদণ্ড, সেই আলোকে অবশ্যই ভালো নির্বাচন করার জন্য আমাদের প্রচেষ্টা থাকবে। আমাদের নিজস্ব কোনো মোটিভ নেই। আমরা ভালো নির্বাচন করার জন্যই দায়িত্ব নিয়েছি। ভালো নির্বাচন করার জন্য যা যা প্রয়োজন, সবই আমরা করব। আইন অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা থাকবে।’
নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা এবং তাদের সহযোগিতা চাওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি। কমিশনের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতায় একটি সুষ্ঠু ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার ও পেশিশক্তির ব্যবহার ঠেকানোর বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, নির্বাচনে বিচারিক ও নির্বাহী—দুই ধরনের ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন। কেউ নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা করলে বিধি অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মারামারি, বিশৃঙ্খলা কিংবা পেশিশক্তি প্রয়োগের ঘটনায় কোনো পক্ষকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি। কোনো প্রার্থী এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তাঁর প্রার্থিতা বাতিল করা হতে পারে।
তবে কমিশনের উদ্দেশ্য শুধু শাস্তি দেওয়া নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষ যাতে অপরাধ থেকে বিরত থাকে এবং নির্বাচনী আইন মেনে চলে, সে ধরনের পরিবেশ তৈরি করাই কমিশনের লক্ষ্য।
নির্বাচনী অপরাধে দুই বছরের কারাদণ্ডের বিধান
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অনিয়ম, ভয়ভীতি প্রদর্শন, বলপ্রয়োগ এবং ভোটারদের বাধা দেওয়ার মতো অপরাধ প্রতিরোধে সংশোধিত নির্বাচনী বিধিমালায় শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) নির্বাচন বিধিমালার ৮০(ক) বিধি অনুযায়ী, নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিকে হুমকি দেওয়া, ভয়ভীতি প্রদর্শন, আঘাত করা কিংবা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তাঁর দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া বা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
একইভাবে নির্বাচন কমিশন অনুমোদিত গণমাধ্যম প্রতিনিধি ও পর্যবেক্ষকদের কাজে বাধা দেওয়া, তাঁদের শারীরিক ক্ষতি করা কিংবা দায়িত্ব পালনে ব্যবহৃত সরঞ্জাম নষ্ট করাও অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
এ ছাড়া ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া, কোনো প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র দাখিল থেকে বিরত রাখা কিংবা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে বাধ্য করার মতো কর্মকাণ্ডও এই বিধির আওতায় পড়বে।
এসব অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড, অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড দেওয়ার বিধান রয়েছে।
বিধি ভাঙলে প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে কমিশন
নির্বাচনী বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও রয়েছে নির্বাচন কমিশনের।
কোনো উৎস থেকে পাওয়া রেকর্ড বা লিখিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কমিশনের কাছে প্রতীয়মান হলে যে চেয়ারম্যান বা সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো প্রার্থী কিংবা তাঁর নির্বাচনী এজেন্ট বিধিমালা লঙ্ঘন করেছেন বা লঙ্ঘনের চেষ্টা করেছেন, কমিশন তাৎক্ষণিক তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবে।
তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে কমিশন সন্তুষ্ট হলে এবং আইনগত শর্ত পূরণ হলে লিখিত আদেশের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে।
অর্থাৎ, নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ উঠলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রার্থিতা বাতিল হবে না। অভিযোগের তদন্ত, প্রমাণ এবং বিধিমালায় নির্ধারিত শর্ত পূরণের ভিত্তিতেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
অনিয়ম হলে স্থগিত হতে পারে কেন্দ্রের ফল
নির্বাচনী অনিয়মের কারণে কোনো ভোটকেন্দ্রের ফলাফল প্রভাবিত হলে তা স্থগিত করার ক্ষমতাও রয়েছে কমিশনের।
সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, বলপ্রয়োগ, ভয়ভীতি প্রদর্শন, কারসাজি কিংবা অন্য কোনো অপকর্মের মাধ্যমে কোনো কেন্দ্র বা একাধিক কেন্দ্রের ফলাফল প্রভাবিত হয়েছে বলে কমিশনের কাছে প্রতীয়মান হলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলোর ফলাফল স্থগিত করা যেতে পারে।
এরপর প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান ও পর্যালোচনার মাধ্যমে ফলাফল প্রকাশের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব। পরিস্থিতি বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় ভোটগ্রহণের নির্দেশও দিতে পারে কমিশন।
এ ছাড়া নির্বাচনী অপরাধ ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা পর্যবেক্ষণে মনিটরিং কমিটি গঠনের বিধান রয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর কমিশন নির্ধারিত সংখ্যক উপযুক্ত কর্মকর্তার সমন্বয়ে এসব কমিটি গঠন করতে পারবে। তাদের দায়িত্ব হবে নির্বাচনী অপরাধ ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা।
সুষ্ঠু নির্বাচনের বড় পরীক্ষা মাঠপর্যায়ে
প্রায় ৪ হাজার ৩০০ ইউনিয়ন পরিষদে পাঁচ ধাপে নির্বাচন আয়োজন করতে গিয়ে কমিশনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, নির্বাচনী আচরণবিধি কার্যকর করা এবং ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করা।
ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ, নির্বাচনী অপরাধের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা, প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতা এবং অনিয়মপূর্ণ কেন্দ্রে পুনরায় ভোটগ্রহণের বিধান থাকলেও এসব পদক্ষেপের কার্যকারিতা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে নিরপেক্ষ প্রয়োগের ওপর।
রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা, প্রশাসনের সমন্বিত ভূমিকা এবং নির্বাচন কমিশনের দৃশ্যমান নিরপেক্ষতা—এই তিনটি বিষয়ই ইউপি নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে, পাঁচ ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে কমিশন, অন্যদিকে নির্বাচনী অপরাধ নিয়ন্ত্রণেও কঠোর অবস্থানের বার্তা দেওয়া হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত পরিকল্পনা ও আইনগত ক্ষমতার কতটা কার্যকর প্রয়োগ মাঠপর্যায়ে নিশ্চিত করতে পারে নির্বাচন কমিশন।