২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ, সাগরে ফের ইলিশ ধরার ব্যস্ততায় ফিরছেন জেলেরা
ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে দেওয়া টানা ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে ২৯ অক্টোবর মধ্যরাতে। নিষেধাজ্ঞার সময় কর্মহীন থাকা জেলেরা এখন নদীতে ইলিশ ধরতে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ উপলক্ষে সরগরম হয়ে উঠেছে চাঁদপুরের মেঘনা নদীর তীরবর্তী জেলেপল্লীগুলো। কোথাও চলছে জাল মেরামত, কোথাও নৌকা প্রস্তুত করছেন জেলেরা।
তবে নিষেধাজ্ঞা চলাকালে এক শ্রেণির অসাধু জেলে মা ইলিশ শিকার করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় জেলেরা। তাঁদের দাবি, সরকারি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে প্রশাসনের অভিযান আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, নিজেদের সক্ষমতার মধ্যে থেকে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হয়েছে।
সরেজমিনে চাঁদপুর সদর উপজেলার আনন্দবাজার, টিলাবাড়ি, বড় স্টেশন, পুরানবাজারের রনাগোয়াল, ইব্রাহীমপুরের রামদাসদী ও বহরিয়া এলাকার জেলেপল্লীগুলো ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ জেলে নদীতে নামার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। ইলিশ ধরার জাল মেরামতের পাশাপাশি নৌকা সংস্কার ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম গোছানোর কাজ করছেন তাঁরা। দীর্ঘ বিরতির পর নদীতে নেমে ইলিশ ধরার আশায় দিন গুনছেন জেলেরা।
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও মা ইলিশ শিকারের অভিযোগ
চাঁদপুরের আনন্দবাজার এলাকার জেলে ইব্রাহিম হোসেন বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময় মেঘনা নদীতে ইলিশের বিচরণ তুলনামূলক কম ছিল। তবে পাশের মুন্সীগঞ্জ ও শরীয়তপুর জেলার কিছু জেলে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে মা ইলিশ শিকার করেছেন বলে অভিযোগ তাঁর।
তিনি বলেন, “এখন নদীতে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছি। এ জন্য জাল মেরামত করছি।”
ইব্রাহীমপুর ইউনিয়নের রামদাসদী গ্রামের জেলে মইজা জানান, তাঁরা গোল্টিজাল দিয়ে ইলিশ ধরেন। নিষেধাজ্ঞার সময় জীবিকার তাগিদে রিকশা চালিয়ে সংসার চালিয়েছেন। এখন আবার নদীতে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তিনি বলেন, ইলিশ পাওয়া গেলে সংসার ভালোভাবে চলবে। আর মাছ না পেলে ঋণ করে চলতে হবে। নদীতে মাছ পাওয়ার ওপরই তাঁদের পরিবারের আয়-রোজগার অনেকাংশে নির্ভরশীল।
লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নের সাখুয়া গ্রামের জেলে রমজান মিজি বলেন, প্রকৃত জেলেরা সরকারি নিষেধাজ্ঞা মেনে চললেও এক শ্রেণির জেলে নিষেধাজ্ঞা শুরুর পর থেকেই মা ইলিশ শিকার করেন বলে তাঁর অভিযোগ। প্রশাসন অভিযান চালিয়ে তাঁদের আটক করলেও এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
রমজান মিজির ভাষ্য, প্রশাসন কঠোর অবস্থানে থাকলে নিষেধাজ্ঞার সময় কেউ নদীতে নামার সাহস পাবেন না।
২৫ কেজি চাল দিয়ে চলে না সংসার
নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের দেওয়া সরকারি খাদ্যসহায়তা অপর্যাপ্ত বলে অভিযোগ করেছেন জেলেরা। তাঁদের দাবি, ২২ দিনের জন্য দেওয়া ২৫ কেজি চাল দিয়ে একটি পরিবারের সংসার চালানো কঠিন। চালের পাশাপাশি নগদ অর্থ কিংবা অন্যান্য খাদ্যসহায়তা দেওয়া হলে তাঁদের দুর্ভোগ কিছুটা কমত।
রমজান মিজি বলেন, অনেক জেলে ঋণ নিয়ে জাল ও নৌকায় বিনিয়োগ করেন। মাছ ধরা বন্ধ থাকলে তাঁদের আয়ও বন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্থায় সংসারের খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হয়। তাই নিষেধাজ্ঞার সময় খাদ্যসহায়তার পাশাপাশি নগদ অর্থের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
সাড়ে ৩৫০ জেলে আটক, দাবি নৌ পুলিশের
চাঁদপুর নৌ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আজমগীর হোসেন বলেন, ইলিশের ডিম ছাড়ার মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে নৌ পুলিশ চাঁদপুর অঞ্চলের সব ইউনিট আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছে। এরপরও কিছু বিচ্ছিন্ন এলাকায় জেলেরা মা ইলিশ শিকার করেছেন।
আইন অমান্য করার অভিযোগে প্রায় সাড়ে ৩৫০ জন জেলেকে আটক করে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
চাঁদপুর সদর উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক বলেন, জেলা ও উপজেলা টাস্কফোর্স ২৪ ঘণ্টা অভিযান পরিচালনা করেছে। এরপরও কিছু জেলে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেছেন। তাঁদের অধিকাংশকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
তবে শিশুদের ব্যবহার করে মা ইলিশ শিকারের ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।
খাদ্যসহায়তা বাড়ানোর পক্ষে মৎস্য কর্মকর্তা
জেলেদের খাদ্যসহায়তা বাড়ানোর দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক। তিনি বলেন, ২৫ কেজি চাল দিয়ে একটি পরিবারের সংসার চালানো কঠিন। গত বছর বৃহত্তর কুমিল্লা মৎস্য উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় জেলেদের চালের পাশাপাশি অন্যান্য খাদ্যসহায়তাও দেওয়া হয়েছিল। তবে বর্তমানে এ খাতে বরাদ্দ নেই।
তিনি আরও বলেন, জেলেদের সহায়তার বরাদ্দ বাড়ানোর বিষয়ে তাঁরা আন্তরিক। এ বিষয়ে নিয়মিত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে নিজেদের সক্ষমতার মধ্যে থেকে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে অভিযান সফল হয়েছে বলে দাবি করেন এই কর্মকর্তা।
নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে ইলিশ ধরতে নামার অপেক্ষায় থাকা জেলেদের এখন প্রত্যাশা, নদীতে পর্যাপ্ত ইলিশ পাওয়া যাবে এবং তা বিক্রি করে তাঁরা আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবেন। পাশাপাশি ভবিষ্যতে মা ইলিশ রক্ষায় প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও জেলেদের জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।