মহেশখালীতে পুলিশের অভিযানে এলজি ও কার্তুজসহ গ্রেপ্তার ১
কক্সবাজারের মহেশখালীতে পুলিশের বিশেষ অভিযানে গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে। হত্যার উদ্দেশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে অবস্থানের গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত এ অভিযানে একটি দেশীয় তৈরি এলজি ও এক রাউন্ড ১২ বোর কার্তুজ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ সময় মো. লোকমান (৩২) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, বিভিন্ন সময়ে দায়ের হওয়া ১১টি মামলায় তাঁর নাম রয়েছে। অভিযানের সময় তাঁর সহযোগী সন্দেহে চার-পাঁচজন পালিয়ে গেছেন। পরে গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে নিয়ে আসার পথে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় দুই সদস্য আহত হন।
সোমবার (২ নভেম্বর) রাত ৭টা ৫ মিনিটে মহেশখালী উপজেলার হোয়ানক ইউনিয়নের কাঠালতলী পাড়ার ছড়ার পাশে বাঁশতলা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) মহেশখালী থানা পুলিশের দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান
পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, পুলিশ সুপার, কক্সবাজারের দিকনির্দেশনায় এবং মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুস সুলতানের তত্ত্বাবধানে পিএসআই মোহাম্মদ ইকবালের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে।
অভিযানের আগে পুলিশ গোপন সূত্রে জানতে পারে, হোয়ানক ইউনিয়নের কাঠালতলী পাড়ার ছড়ার পাশে বাঁশতলা এলাকায় কয়েকজন সশস্ত্র ব্যক্তি একজনকে হত্যার উদ্দেশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে অবস্থান করছেন। এ তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে সেখানে অবস্থানরত ব্যক্তিরা পুলিশকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়েন বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, পরিস্থিতি মোকাবিলায় আত্মরক্ষার্থে তারাও পাল্টা গুলি চালায়। একপর্যায়ে সশস্ত্র ব্যক্তিরা দিকবিদিক ছুটে পাহাড়ের দিকে পালিয়ে যান। এ সময় পুলিশ লোকমানকে আটক করতে সক্ষম হয়। বাকি চার-পাঁচজন পালিয়ে যান বলে পুলিশের দাবি।
লুঙ্গির কোমরের ভাঁজে এলজি ও কার্তুজ
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আটক লোকমানকে ঘটনাস্থল থেকে নিয়ে আসার সময় তাঁর সহযোগী ও পরিবারের সদস্যরা পুলিশের ওপর আক্রমণ চালান। এতে দুই পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে তাঁদের মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
এরপর উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে লোকমানের দেহ তল্লাশি করা হয়। এ সময় তাঁর পরিহিত লুঙ্গির বাম কোমরের ভাঁজ থেকে একটি দেশীয় তৈরি এলজি ও লাল রঙের একটি ১২ বোর কার্তুজ উদ্ধার করা হয়। রাত ৭টা ৩০ মিনিটে জব্দতালিকা প্রস্তুত করে অস্ত্র ও কার্তুজ জব্দ করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
১১ মামলায় সংশ্লিষ্টতার তথ্য
গ্রেপ্তার লোকমান (৩২) মহেশখালী উপজেলার কালারমারছড়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের নোনাছড়ি এলাকার মৃত ছৈয়দ আহমদের ছেলে। পুলিশের দাবি, সিডিএমএস ও থানার রেকর্ডপত্র যাচাই করে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে দায়ের হওয়া ১১টি মামলায় সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. মাদক মামলা: ১০ অক্টোবর ২০২১ তারিখে মহেশখালী থানায় দায়ের করা এফআইআর নং ৮/২৮৮। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৩৬(১) সারণির ১০(ক) ধারায় মামলাটি করা হয়।
২. ডাকাতির প্রস্তুতির মামলা: ২৯ আগস্ট ২০২১ তারিখে দায়ের করা এফআইআর নং ২৭/২৪১। দণ্ডবিধির ৩৯৯/৪০২ ধারায় মামলা।
৩. অস্ত্র মামলা: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে দায়ের করা এফআইআর নং ১৩, জিআর নং ১৬০। অস্ত্র আইনের ১৯(ক) ধারায় মামলা।
৪. হামলা ও হত্যাচেষ্টার মামলা: ২২ জুলাই ২০১৯ তারিখে দায়ের করা এফআইআর নং ১৯/১৯৫। দণ্ডবিধির ১৪৩/৩৪১/৩২৩/৩২৬/৩০৭/৩৭৯/৫০৬ ধারায় মামলা।
৫. হত্যা মামলা: ১৮ অক্টোবর ২০১৯ তারিখে দায়ের করা এফআইআর নং ১৯/২৮৪। দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় মামলা।
৬. হামলা ও হত্যাচেষ্টার আরেকটি মামলা: ২১ জুলাই ২০১৯ তারিখে দায়ের করা এফআইআর নং ১৭/১৯৩। দণ্ডবিধির ১৪৩/৪৪৭/৩২৩/৩২৫/৩০৭/৩৭৯/৫০৬ ধারায় মামলা।
৭. নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা: ৭ আগস্ট ২০২২ তারিখে দায়ের করা এফআইআর নং ৯/২২৫, জিআর নং ২২৫। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯(৩) ধারায় মামলা।
৮. অনধিকার প্রবেশ ও অন্যান্য অপরাধের মামলা: ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ তারিখে দায়ের করা এফআইআর নং ১/১৬। দণ্ডবিধির ১৪৩/৪৪৭/৩৪২/৪২৭/৩৭৯/৫০৬ ধারায় মামলা।
৯. হামলা ও হত্যাচেষ্টার মামলা: ৮ জুন ২০১১ তারিখে দায়ের করা এফআইআর নং ৪, জিআর নং ১১৪/১১। দণ্ডবিধির ১৪৩/৪৪৮/৩২৩/৩২৪/৩২৬/৩০৭/৩৭৯ ধারায় মামলা।
১০. অস্ত্র আইনের মামলা: ২০ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে দায়ের করা এফআইআর নং ৮/২৪৬। ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনের ১৯ ধারাসংশ্লিষ্ট এ মামলায় অভিযোগপত্রে লোকমানের নাম রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
১১. পুলিশের কাজে বাধা ও হামলার মামলা: ১৩ অক্টোবর ২০১৭ তারিখে দায়ের করা এফআইআর নং ৮/২৭৫। দণ্ডবিধির ১৪৭/১৪৮/১৪৯/৩৩২/৩৩৩/৩৫২/৩৫৩/৩৭৯/১১৪ ধারায় মামলা।
পুলিশের দেওয়া তথ্যে এসব মামলার কয়েকটিতে লোকমানের বিরুদ্ধে এজাহারে অভিযুক্ত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কয়েকটি মামলায় অভিযোগপত্রেও তাঁর নাম রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে মামলাগুলোর বর্তমান বিচারিক অবস্থা, জামিন, অব্যাহতি কিংবা নিষ্পত্তির বিষয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
পলাতকদের পরিচয় ও অস্ত্রের উৎস নিয়ে প্রশ্ন
অভিযানের সময় পুলিশের ওপর গুলি ছোড়ার অভিযোগে চার-পাঁচজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি পালিয়ে যাওয়ায় তাঁদের পরিচয় ও অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তাঁরা কারা, কী উদ্দেশ্যে সেখানে অবস্থান করছিলেন এবং কথিত হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গে তাঁদের সংশ্লিষ্টতা কতটুকু—তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে উদ্ধার করা আগ্নেয়াস্ত্রের উৎস, অস্ত্রটি আগে কোনো অপরাধে ব্যবহার করা হয়েছিল কি না এবং কার্তুজটির প্রকৃতি ও কার্যকারিতা পরীক্ষা করাও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
জননিরাপত্তায় অভিযান কতটা কার্যকর হবে?
দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীর বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ অস্ত্র, সংঘবদ্ধ অপরাধ ও সহিংসতার অভিযোগ জননিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের বিষয়। এ পরিস্থিতিতে পুলিশের বিশেষ অভিযান ও অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার অংশ।
তবে শুধু অভিযান বা গ্রেপ্তারেই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত হয় না। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের উৎস অনুসন্ধান, পলাতক ব্যক্তিদের শনাক্ত, মামলাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আদালতে গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মহেশখালী থানা পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তি ও অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তথ্যসূত্র: মহেশখালী থানা পুলিশের ৩ নভেম্বর ২০২৬ তারিখের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি।