চার ভাগে বিভক্ত হবে সেন্টমার্টিন
দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন, অবাধ পর্যটন ও মুনাফাকেন্দ্রিক স্থাপনার চাপে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন আজ অস্তিত্ব সংকটে। প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় মানুষের জীবনযাপন। এই বাস্তবতায় দ্বীপটিকে রক্ষায় চারটি আলাদা জোনে ভাগ করার প্রস্তাব এসেছে খসড়া মহাপরিকল্পনায়।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) প্রণীত এই খসড়া পরিকল্পনা রাজধানীতে আয়োজিত এক কর্মশালায় উপস্থাপন করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ‘জেনারেল ইউজ জোন’-এ পর্যটন ও সাধারণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম চলবে এবং সব হোটেল ও রিসোর্ট এই এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। কচ্ছপের প্রজননক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত ‘ম্যানেজড রিসোর্স জোন’-এ দিনে পর্যটক প্রবেশ করতে পারলেও রাতে থাকার অনুমতি থাকবে না এবং স্থানীয়রাও এখানকার প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করতে পারবে না। বুশল্যান্ড, লেগুন ও ম্যানগ্রোভ বনঘেরা ‘সাসটেইনেবল ইউজ জোন’-এ স্থানীয়দের সীমিতভাবে সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ থাকবে, তবে পর্যটকদের রাতযাপন নিষিদ্ধ থাকবে। আর জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের স্বার্থে ‘রেস্ট্রিক্টেড জোন’-এ কোনো ধরনের প্রবেশই অনুমোদিত হবে না।
খসড়া মহাপরিকল্পনায় বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার, পর্যটন নিয়ন্ত্রণ, সামুদ্রিক সম্পদ ও জীবিকা সুরক্ষা এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলাকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি জেনারেটরের পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
কর্মশালায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, সরকার এ মুহূর্তে সেন্টমার্টিনের হারিয়ে যাওয়া জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তিনি বলেন, সেন্টমার্টিন ও পর্যটন এক বিষয় হতে পারে না; দ্বীপটির প্রথম অগ্রাধিকার হতে হবে সংরক্ষণ। ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পর্যটক নিষেধাজ্ঞার ফলে দ্বীপের বাস্তুতন্ত্রে ইতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, আট হাজার মানুষের একটি দ্বীপে প্রতিদিন যদি দশ হাজার পর্যটক যায়, তাহলে সেটি স্থানীয়দের জন্য কোনোভাবেই সুখকর নয়। পর্যটনের চাপ সরাসরি পরিবেশ ও মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে আঘাত হানে। তাই ভবিষ্যতের পর্যটন ব্যবস্থাপনা হবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য কৃষি, মৎস্য, হস্তশিল্প ও সীমিত পর্যটন ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
বিশেষজ্ঞরা কর্মশালায় জানান, দ্বীপের প্রায় ৭০ শতাংশ প্রবাল ইতোমধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে এবং দক্ষিণ-পূর্ব অংশের কিছু এলাকা সাম্প্রতিক সময়ে বিলীন হয়েছে। অতিরিক্ত লবস্টার আহরণে প্রজাতিটি প্রায় বিলুপ্তির পথে, আর জাহাজের নোঙরের আঘাতে প্রবাল আরও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হোটেল ও রিসোর্ট নির্মাণের ফলে বিদেশি উদ্ভিদ প্রজাতির বিস্তারও বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
ইউএনডিপির বাংলাদেশের ডেপুটি রেসিডেন্ট রিপ্রেজেনটেটিভ সোনালী দায়ারত্নে বলেন, জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ সেন্টমার্টিন সংরক্ষণ পরিকল্পনায় যুক্ত হতে পেরে তারা আনন্দিত এবং ভবিষ্যতেও এই উদ্যোগে সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সেন্টমার্টিন দ্বীপে পর্যটনের লাগাম টেনে ধরে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার পথে একটি বড় পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র: সমকাল