কক্সবাজার জেলা

পুনর্বাসনের আকুতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের: আল্টিমেটামের পর কক্সবাজার সৈকতে ৫০০ স্থাপনা অপসারণ

প্রশাসনের আল্টিমেটামের পর রোববার (১৫ মার্চ) দুপুরে কক্সবাজারের সুগন্ধা পয়েন্টের বালিয়াড়ি থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে পাঁচ শতাধিক স্থাপনা। প্রশাসনের কড়াকড়ির মুখে ব্যবসায়ীরা নিজ উদ্যোগেই সরিয়ে নেন তাদের দোকানপাট ও মালামাল। তবে দ্রুত পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন তারা। জানা যায়, সুগন্ধা পয়েন্টের বালিয়াড়ির স্থাপনাগুলো সরিয়ে নিতে রোববার সকাল ১০টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয় প্রশাসন। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও অনেক ব্যবসায়ী স্থাপনা সরাননি। পরে বেলা ১২টার দিকে জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ ও আনসারের সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। শুরু হয় আবারও মাইকিং। এরপরই পাল্টে যায় পরিস্থিতি। ব্যবসায়ীরা নিজ উদ্যোগে স্থাপনা সরাতে শুরু করেন। সব স্থাপনা সরাতে সময় লাগে বিকেল ৩টা পর্যন্ত। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টের ব্যবসায়ী নজির আহমদ। দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে এই পয়েন্টে পর্যটকদের কাছে বার্মিজ পণ্য বিক্রি করে ১১ সদস্যের পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করতেন। উচ্ছেদের পর নিজের অসহায়ত্বের কথাই জানালেন তিনি।

ব্যবসায়ী নজির আহমদ বলেন, ‘এই দোকানটাই ছিল আমার পুরো পরিবারের একমাত্র জীবিকার উৎস। আমার পরিবারে দুই ছেলে, এক মেয়ে, মা ও ভাই—বোনসহ প্রায় ১১ জন সদস্য রয়েছে। সবাই এই দোকানের আয়েই চলতাম। এতদিন এখান থেকে ব্যবসা করে পরিবার নিয়ে কোনোরকমে সুখে—শান্তিতে জীবন কাটাচ্ছিলাম।’

তিনি বলেন, ‘এখন দোকান সরিয়ে নিতে হচ্ছে। রমজান মাস চলছে ও সামনে ঈদ—কিন্তু আমাদের ভবিষ্যৎ কী হবে তা আল্লাহই ভালো জানেন। বাচ্চাদের কী জবাব দেবো, সেটাও বুঝতে পারছি না। তাদের জন্য এখনো ঈদের কাপড় পর্যন্ত কিনে দিতে পারিনি। কারণ গত এক মাস ধরে প্রায় দোকান বন্ধ ছিল, তেমন কোনো বেচাকেনাও হয়নি।’ শুধু নজির আহমদই নন, সুগন্ধা পয়েন্টের বালিয়াড়ির দোকানপাট সরানোর পর সহগ্রাধিক ব্যবসায়ী পড়েছেন চরম অনিশ্চয়তায়।

এ বিষয়ে শামুক- ঝিনুক বিক্রেতা শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রশাসনের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানিয়ে আমরা নিজেরাই দোকান সরিয়ে নিয়েছি। কিন্তু এর কষ্ট ও বেদনা আমাদের বুকেই থেকে যাচ্ছে। ঈদের ব্যবসার আশায় আমরা অনেকেই ঋণ করে দোকানে পুঁজি দিয়েছিলাম। এখন হঠাৎ উচ্ছেদের কারণে প্রায় পাঁচ—ছয় লাখ টাকার মতো ক্ষতির মুখে পড়েছি। এই ক্ষতি কীভাবে পুষিয়ে নেবো, তা আল্লাহই ভালো জানেন।’

উচ্ছেদ অভিযান চলাকালে ব্যবসায়ীরা জানান, সৈকতের সৌন্দর্য রক্ষায় সরকারের এই সিদ্ধান্তকে তারা স্বাগত জানান। তবে এই ব্যবসার ওপর নির্ভর করেই তাদের শত শত পরিবারের জীবিকা নির্বাহ হতো। দীর্ঘদিনের সাজানো ব্যবসা হারিয়ে তারা এখন দিশেহারা। তাই মানবিক দিক বিবেচনা করে দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো স্থানে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

বার্মিজ পণ্যের দোকানদার নুরুল বশর বলেন, ‘রমজানজুড়ে আমরা ঈদের বিক্রির আশায় দোকানে মালামাল তুলেছিলাম। এখন সেই পণ্য নিয়েই আমরা বিপাকে পড়েছি, সামনে কীভাবে চলবো সেটাও বুঝতে পারছি না।’ বার্মিজ আচারের দোকানদার মোরশেদ আলী বলেন, ‘আমাদের অবস্থা এখন এমন—যেন কাউকে সাগরের মাঝখানে নৌকা ছাড়া ফেলে দেয়া হয়েছে। এই দোকানই ছিল আমাদের একমাত্র জীবিকা। রোজার মাসে ধার—দেনা করে আমরা দোকানের মালামাল তুলেছি। কিন্তু হঠাৎ উচ্ছেদের কারণে সবকিছু অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা প্রশাসনের কাছে অন্তত এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় চেয়েছিলাম, যেন ঈদের পর কিছু টাকা শোধ করে নিজেরাই দোকান সরিয়ে নিতে পারি। কিন্তু সেই আবেদনও রাখা হয়নি। এতে হাজারো পরিবার চরম বিপদের মধ্যে পড়ে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এই দেশেরই নাগরিক। আমাদেরও বেঁচে থাকার অধিকার আছে। সৈকত পরিষ্কার করতে প্রশাসনের উদ্যোগে আমাদের আপত্তি নেই। তবে এখানে ব্যবসা করতে না দিলে অন্তত বিকল্প কোনো জায়গায় আমাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হোক, যাতে পরিবার—পরিজন নিয়ে আমরা জীবিকা নির্বাহ করতে পারি।’ এ দিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পর্যায়ক্রমে সৈকতের লাবনী ও কলাতলী পয়েন্টের বালিয়াড়িতে থাকা স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধেও একই ধরনের উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (পর্যটন সেল) মনজু বিন আফনান বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা নিজ দায়িত্বেই এই জায়গা থেকে তাদের দোকানপাট সরিয়ে নিয়েছে। শনিবার (১৪ মার্চ) তাদের জানানো হয়েছিল, তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে রোববার সকাল ১০টা পর্যন্ত সময় দেয়া হয়েছে। তবে দোকান ও মালামালের সংখ্যা বেশি হওয়ায় সকালে তারা আরও কিছু সময় চেয়ে আবেদন করেন। সে প্রেক্ষিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের অতিরিক্ত কিছু সময় দেয়া হয়। নির্ধারিত সেই সময়ের মধ্যেই তারা তাদের দোকানপাট সরিয়ে নেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘উচ্ছেদ কার্যক্রম এভাবেই চলমান থাকবে এবং পর্যায়ক্রমে সৈকতের অন্যান্য এলাকাতেও অভিযান পরিচালনা করা হবে।’ পুনর্বাসনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নেবেন। ব্যবসায়ীরা তাদের যেকোনো অভিযোগ বা দাবি কর্তৃপক্ষের কাছে জানাতে পারবেন। সেসব বিষয় বিবেচনা করে পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’ তিনি জানান, প্রথমে সৈকতের বালিয়াড়িগুলো দখলমুক্ত করে পরিষ্কার করা হবে। এরপর ধাপে ধাপে পুরো সৈকত এলাকায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনার পর গত তিন দিনে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে প্রায় ৬৩০টি স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে জেলা প্রশাসন।

ক্যাটাগরি