মহেশখালী

সোনাদিয়া থেকে অবৈধ ঘের উচ্ছেদ করবে নৌবাহিনী

কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার সোনাদিয়া দ্বীপে ম্যানগ্রোভ বন কেটে গড়ে তোলা অবৈধ চিংড়িঘের উচ্ছেদে নৌবাহিনীকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ–সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবে গত ৩ আগস্ট অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী, ‘স্ট্রেনদেনিং ক্যাপাসিটি অব এমওইএফসিসি, ডিওই অ্যান্ড বিএফডি ফর ন্যাচারাল রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইমপ্রুভড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স’ প্রকল্পের আওতায় এ কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা খানম বলেন, সোনাদিয়া দ্বীপকে অবৈধ দখলমুক্ত করতে নৌবাহিনী সহায়তা দিতে প্রস্তুত। উচ্ছেদের পাশাপাশি দ্বীপটির জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ম্যানগ্রোভ বনের ভেতরের ছোট ছোট খাল দিয়ে জোয়ার-ভাটার পানি প্রবেশ করে। এতে বনের বাস্তুতন্ত্র সচল থাকে। খালের মুখে বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহ বন্ধ করে দিলে বন শুকিয়ে যায় এবং এর সুযোগ নিয়ে দখলদাররা বন কেটে চিংড়িঘের তৈরি করে। তাই বন পুনরুদ্ধারে জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালে পরিবেশগত গুরুত্ব বিবেচনায় সোনাদিয়া দ্বীপকে প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করা হয়। এরপরও দ্বীপটিতে ম্যানগ্রোভ বন দখল ও ধ্বংসের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। বন বিভাগের হিসাবে, সোনাদিয়ায় অন্তত ৭ হাজার একর প্যারাবন কেটে ফেলা হয়েছে।

২০১৭ সালে ইকোট্যুরিজম পার্ক প্রতিষ্ঠার জন্য সোনাদিয়ার ৯ হাজার ৪৬৬ দশমিক ৯৩ একর বনভূমি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) কাছে বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে সেখানে ইকোট্যুরিজম কার্যক্রম শুরু হয়নি। বন বিভাগের ভাষ্য, বেজার কাছে বরাদ্দের পর বন বিভাগের আইনগত কর্তৃত্ব কমে যাওয়ায় দখলের মাত্রা আরও বেড়েছে।

পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০২৫ সালের মার্চে সোনাদিয়ার ওই বনভূমি বন বিভাগের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এরই মধ্যে তিনটি মৌজার প্রায় ৮ হাজার ৪৫ একর বনভূমি বন বিভাগের কাছে ফেরত এসেছে। তবে ছয়টি মৌজায় আরও ১২ হাজার ২৭০ একর বনভূমি বেজার আওতায় রয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক ফাহমিদা হক খান জানান, নৌবাহিনীকে সম্পৃক্ত করে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনায় প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পাওয়া গেছে। এ মাসে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, নৌবাহিনী ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে অভিযানের কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হবে। উচ্ছেদে প্রায় ৪ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে, বিপরীতে প্রকল্পে বরাদ্দ রয়েছে ২ কোটি টাকা।

এর আগে ২০২৫ সালে মহেশখালী উপজেলা প্রশাসনের জরিপে সোনাদিয়ায় প্রায় ৪৫ কিলোমিটার বাঁধের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এসব বাঁধ উচ্ছেদে ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল। একই বছর ১১টি অবৈধ চিংড়িঘের উচ্ছেদ করে উপজেলা প্রশাসন।

পরিবেশ আন্দোলনের নেতারা বলছেন, শুধু অবৈধ দখল উচ্ছেদ করলেই হবে না; উচ্ছেদের পর ম্যানগ্রোভ বন ও জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার এবং ভবিষ্যতে নতুন করে দখল ঠেকাতে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।

সোনাদিয়া দ্বীপে সরেজমিনে দেখা গেছে, ম্যানগ্রোভ বনের ভেতরের অনেক খালের মুখ বাঁধ দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিস্তীর্ণ এলাকায় গাছ কেটে চিংড়িঘের তৈরি করা হয়েছে। বনজুড়ে ছড়িয়ে আছে কাটা গাছের অসংখ্য গুঁড়ি।

বন বিভাগের স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, জনবল সংকটের কারণে দখলদারদের প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সোনাদিয়া রক্ষায় বন বিভাগের জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন পরিবেশকর্মীরা।

ক্যাটাগরি