অর্থনীতি

চট্টগ্রাম বন্দরে ধর্মঘট শুরু, পণ্য পরিবহনে অচলাবস্থা

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বাতিলসহ চার দফা দাবিতে ফের অচল হয়ে পড়েছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর। রোববার (সকাল ৮টা) থেকে বন্দর শ্রমিক-কর্মচারীরা কর্মবিরতি শুরু করায় সব ধরনের পণ্য ও কনটেইনার ওঠানামা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

সকাল থেকে বন্দরের বিভিন্ন জেটিতে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস ও বোঝাই কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে থেমে গেছে কনটেইনার ডেলিভারি। বন্দরের ভেতরে কোনো ধরনের ট্রেলার বা পণ্য পরিবহনকারী যানবাহন প্রবেশ করতে দেখা যায়নি। ফলে মাত্র দুই দিন আগে স্থগিত হওয়া কর্মবিরতির পর আবারও পুরো বন্দর অচলাবস্থার মুখে পড়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সমন্বয়ক মো. ইব্রাহীম খোকন গণমাধ্যমকে বলেন, “আজ সকাল থেকেই আমাদের ধর্মঘট চলছে। বন্দরের কোথাও কোনো কাজ হচ্ছে না। শ্রমিক-কর্মচারীরা শতভাগ সমর্থন দিয়ে কর্মবিরতিতে অংশ নিয়েছেন।” তিনি অভিযোগ করে বলেন, আন্দোলন দমাতে বন্দর কর্তৃপক্ষ ভিন্ন কৌশল নিয়েছে। আমাদের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত শামসু মিয়া ও আবুল কালাম আজাদ নামে দুই নেতাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তুলে নিয়ে গেছে বলে আমরা জানতে পেরেছি।

এদিকে পবিত্র রমজান মাস ও আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে চট্টগ্রাম বন্দরের এই অচলাবস্থা দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতিকে গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট মহল। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ফলে দীর্ঘ সময় বন্দর অচল থাকলে শিল্পকারখানায় কাঁচামাল সংকট, রপ্তানি পণ্য জাহাজীকরণে বিলম্ব এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে বড় ধরনের ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ৩১ জানুয়ারি থেকে বন্দর শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মবিরতি শুরু হয়, যা ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে রূপ নেয়। নৌপরিবহন উপদেষ্টার আশ্বাসের পর গত বৃহস্পতিবার আন্দোলন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। তবে এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ১৫ জন শ্রমিক নেতার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি এবং তাদের সম্পদ তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) চিঠি দেওয়া হলে শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

এই ঘটনার প্রতিবাদে শ্রমিক-কর্মচারীদের হয়রানির অভিযোগ তুলে রোববার থেকে আবারও অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্দর অচলের ঘোষণা দেয় চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ ও শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)। আন্দোলনরত ১৫ শ্রমিক নেতাকে শাস্তিমূলকভাবে মোংলা ও পায়রা বন্দরে বদলি করা হলেও তারা কর্মস্থলে যোগ না দিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

বন্দর সূত্র জানায়, গত ৩১ জানুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কর্মবিরতির কারণে চট্টগ্রাম বন্দর ও ১৯টি বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে (আইসিডি) প্রায় ৫১ হাজার থেকে ৫৪ হাজার টিইইউস (২০ ফুট কনটেইনার একক) কনটেইনার আটকা পড়ে। এর মধ্যে জেটিতে থাকা কিছু জাহাজ থেকে পণ্য খালাস শুরু হলেও নতুন করে কর্মবিরতি শুরু হওয়ায় আবারও সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।

বর্তমানে বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ জাহাজের সংখ্যা প্রায় ১০০টি। কর্মবিরতি দীর্ঘ হলে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে জাহাজ ভাড়া ও ডেমারেজ চার্জ বেড়ে আমদানি-রপ্তানিকারকদের আর্থিক ক্ষতি বাড়বে।

শ্রমিক নেতারা বলছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। অন্যদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সরকার কীভাবে এই সংকট সমাধান করবে, সেদিকে তাকিয়ে রয়েছে ব্যবসায়ী মহল ও দেশের অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা।

ক্যাটাগরি