কক্সবাজার জেলা

একাধিক রোহিঙ্গা সদস্যের নামে খুরুশকুলের ফ্ল্যাট বরাদ্দ

কক্সবাজার পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডস্থ কুতুবদিয়াপাড়ায় বসবাসরত একটি পরিবারের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা পরিচয় গোপন করে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে। একই পরিবারের পাঁচ সদস্যের নামে খুরুশকুল জলবায়ু উদ্বাস্তু পুনর্বাসন প্রকল্পের ফ্ল্যাট বরাদ্দের তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০০৮ সালের দিকে টেকনাফের একটি রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে ‘ইসমাইল’ নামের এক ব্যক্তি তাঁর বাবা সোনা আলী, মা মাবিয়া ও পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়াপাড়ায় আসেন। তারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. কায়সারের ভাড়া বাসায় অবস্থান নেন বলে জানিয়েছেন ওই শিক্ষক।

পরবর্তীতে ইসমাইল রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন এবং ধীরে ধীরে তাঁর ভাই-বোনসহ পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য কক্সবাজারে এসে বসবাস শুরু করেন বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। কয়েক বছর পর কুতুবদিয়াপাড়ায় প্রায় এক শতক খাসজমি কথিতভাবে স্থানীয় এক নারীর কাছ থেকে কিনে সেখানে বসতি গড়ার অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, সময়ের সঙ্গে পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। তবে রোহিঙ্গা পরিচয় ও মাদক পাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ততার যেসব অভিযোগ স্থানীয়রা করছেন, সেগুলোর স্বাধীন ও সরকারি নথিভিত্তিক প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি। ফলে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই প্রয়োজন।

পরিবর্তিত পরিচয়ে ভোটার হওয়ার অভিযোগ :
স্থানীয়দের দাবি, ইসমাইল তাঁর প্রকৃত বাবা-মায়ের পরিবর্তে কক্সবাজার পৌরসভার মধ্যম কুতুবদিয়াপাড়ার দিল মোহাম্মদ ও ফেরুজা খাতুনকে বাবা-মা হিসেবে দেখিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।একই পরিবারের অন্য সদস্যদেরও কক্সবাজার পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট জাতীয় পরিচয়পত্রের আবেদন, জন্মনিবন্ধন, ভোটার নিবন্ধনের সময় দাখিল করা কাগজপত্র এবং নির্বাচন কমিশনের সংরক্ষিত তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কেবল স্থানীয়দের বক্তব্যের ভিত্তিতে কারও নাগরিকত্ব বা রোহিঙ্গা পরিচয় চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যায় না।

পাঁচ সদস্যের নামে ফ্ল্যাট :
অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি উঠে এসেছে খুরুশকুল বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্পের ফ্ল্যাট বরাদ্দকে ঘিরে।

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একই পরিবারের পাঁচজনের নামে ফ্ল্যাট বরাদ্দের তালিকায় নাম রয়েছে। তাদের দেওয়া তালিকায় রয়েছে ১. ক্র. ৭১৬, এফপি-১৫৯ — মো. ইউনুস (ভাই), ২. ক্র. ১৩৯৯, এফপি-২৭২ — ফাতেমা আক্তার (বোন), ৩. ক্র. ০৭, বিপি-৪৫০ — মাবিয়া খাতুন (মা), ৪. ক্র. ১০২৯, এসকেপি-৯১ — জন্নাতুল বকেয়া (স্ত্রী), ৫. ক্র. ৩২৯, বিপি-৪৫২ — মো. ইসমাইল হোসেন (নিজ)। এই তালিকার সত্যতা সরকারি বরাদ্দ নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

খুরুশকুল জলবায়ু উদ্বাস্তু পুনর্বাসন প্রকল্পে ২০২৬ সালের ২ আগস্ট লটারির মাধ্যমে ৭৩০টি পরিবারকে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর আগে ৬০০ পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছিল।

এর আগে ২০২৫ সালে প্রকল্পের ৪ হাজার ৪০৯ পরিবারের পুরোনো তালিকাকে ত্রুটিপূর্ণ, প্রশ্নবিদ্ধ ও পক্ষপাতদুষ্ট উল্লেখ করে বাতিল করার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছিল।

এমন প্রেক্ষাপটে একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে বরাদ্দের অভিযোগটি নতুন করে যাচাইয়ের দাবি তৈরি করেছে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. কায়সার বলেন, ইসমাইলসহ তাঁর পরিবারের সদস্যরা একসময় তাঁর বাসায় ভাড়া থাকতেন।
তিনি বলেন, “রোহিঙ্গা ইসমাইলসহ তার পরিবার আমাদের বাসায় ভাড়া থাকত এটা সত্য। সরকারি ফ্ল্যাট বরাদ্দের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার। এনআইডি করার ক্ষেত্রেও গোয়েন্দা সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন।”

কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আকতার কামাল বলেন, সম্প্রতি ৭৩০ পরিবারকে খুরুশকুলে ফ্ল্যাট দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, সেখানে রোহিঙ্গা পরিচয়ের অভিযোগ থাকা ব্যক্তিদেরও ফ্ল্যাট পাওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, “অনেক রোহিঙ্গা এনআইডি করেছে এমন কথা বিভিন্ন মহলেই বলা হয়। কিন্তু এনআইডি থাকলেই কেউ স্থায়ীভাবে বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে যায় না। নাগরিকত্বের বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই করা দরকার।”

তাঁর ভাষ্য, এ ধরনের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন।

‘এক পরিবারে পাঁচজন পেলে আমরা কোথায় যাব?’ :
কুতুবদিয়াপাড়ার বাসিন্দা সিরাজুল করিম ও শাহাব উদ্দিন বলেন, স্থানীয় প্রকৃত সুবিধাবঞ্চিত পরিবারগুলো যেখানে সরকারি আবাসনের অপেক্ষায় রয়েছে, সেখানে একটি পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে ফ্ল্যাট বরাদ্দের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা উচিত।

তাঁদের প্রশ্ন, “একটি পরিবারের পাঁচজন যদি ফ্ল্যাট পায়, তাহলে আমাদের মতো মানুষের আর কী থাকবে? যে ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়েই প্রশ্ন আছে, তিনি যদি আবার ফ্ল্যাট বরাদ্দের তালিকা তৈরির কাজে যুক্ত থাকেন, তাহলে পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, খুরুশকুল আশ্রয়ণ প্রকল্পের ফ্ল্যাটের সম্ভাব্য উপকারভোগীদের তালিকা প্রণয়ন ও যাচাইয়ের কাজে কুতুবদিয়াপাড়ার ‘মুরগির ফার্ম’ এলাকার জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে ইসমাইলকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা হয়েছিল।

এই অভিযোগ সত্য হলে একজন ব্যক্তির নিজের পরিবারের সদস্যদের নাম উপকারভোগীর তালিকায় থাকা এবং একই সঙ্গে তালিকা প্রণয়ন বা যাচাই প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত থাকার ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে কী দায়িত্বে ছিলেন এবং তাঁর দায়িত্বের পরিধি কী ছিল তা সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের নথি থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ যাচাই :
খুরুশকুল বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্প মূলত জলবায়ু ও দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত এবং বিমানবন্দর সম্প্রসারণের কারণে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের জন্য নেওয়া হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী প্রকল্পে হাজার হাজার পরিবার পুনর্বাসনের পরিকল্পনা রয়েছে।

এ অবস্থায় অভিযোগ ওঠা পরিবারের সদস্যদের প্রকৃত পরিচয়, জন্মনিবন্ধন, পূর্ববর্তী বসবাসের ইতিহাস, জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির সময় দাখিল করা কাগজপত্র, ভোটার এলাকা পরিবর্তনের তথ্য এবং খুরুশকুল প্রকল্পের উপকারভোগী হওয়ার যোগ্যতা সবকিছু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি উঠেছে।

বিশেষ করে একই পরিবারের পাঁচ সদস্যের নামে ফ্ল্যাট বরাদ্দের অভিযোগ সত্য কি না, তাঁরা প্রকল্পের নির্ধারিত যোগ্যতার মধ্যে পড়েন কি না এবং উপকারভোগীর তালিকা তৈরিতে তাঁদের কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব ছিল কি না এসব প্রশ্নের উত্তর সরকারি নথি যাচাইয়ের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।

স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগগুলো তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আর অভিযোগ অসত্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা সন্দেহও সরকারি তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করা হোক।

ক্যাটাগরি