জাতীয়

ফিরতে চান, তবে নিরাপদে: পাঁচ শর্তে অনড় ৮৭% রোহিঙ্গা

সবচেয়ে বেশি আস্থা বাংলাদেশ সরকারের ওপর

নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও পরিচয়ের স্বীকৃতিসহ পাঁচটি শর্ত পূরণ না হলে মিয়ানমারে ফিরতে চান না ৮৭ শতাংশের বেশি রোহিঙ্গা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, রোহিঙ্গাদের কাছে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সরকার; প্রায় ৫৬ শতাংশ রোহিঙ্গা এমন মত দিয়েছেন।

বুধবার (৭ অক্টোবর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন মিলনায়তনে ‘অনিশ্চিত ঘরে ফেরা: উখিয়ার ক্যাম্প থেকে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিয়ে রোহিঙ্গাদের ভাবনা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এ উপলক্ষে দিনব্যাপী প্যানেল আলোচনারও আয়োজন করা হয়।

গবেষণায় উখিয়ার ১৭টি রোহিঙ্গা শিবিরে গত ২ থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত ৮১৬ জনের মতামত নেওয়া হয়। অংশগ্রহণকারীদের ৬৫ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৫ শতাংশ নারী। এ ছাড়া ৭২ জনের বিস্তারিত সাক্ষাৎকার, হেড মাঝিদের নিয়ে ফোকাস গ্রুপ আলোচনা এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। গবেষণায় ৩৬টি বিষয় বা থিম ধরে গুণগত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ৮১৬ জনের মধ্যে ৭১৩ জন, অর্থাৎ ৮৭ শতাংশের বেশি, বর্তমান পরিস্থিতিতে মিয়ানমারে ফিরতে চান না। তবে গবেষকদের মতে, এর অর্থ তাঁরা চিরতরে মিয়ানমারে ফিরতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন—এমন নয়। নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও পরিচয়ের স্বীকৃতি, জমি ও বাড়িঘর ফিরিয়ে দেওয়া ও পুনর্বাসন, অবাধ চলাচল এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবিকার মতো মৌলিক সেবা নিশ্চিত করা এবং বিচার ও জবাবদিহির নিশ্চয়তা পেলে তাঁরা প্রত্যাবাসনে আগ্রহী।

জরিপে অংশ নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রায় ২০ শতাংশ জানিয়েছেন, মিয়ানমারে তাঁদের স্থায়ী সম্পত্তি-সংক্রান্ত নথি রয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, সহিংসতার অভিজ্ঞতার পাশাপাশি শিবিরে দীর্ঘদিনের অনিশ্চিত জীবনও প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। শিক্ষা, জীবিকা ও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, নিয়ন্ত্রিত চলাচল, মানব পাচার, অপহরণ, চাঁদাবাজি এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর কারণে নিরাপত্তাহীনতার বিষয়গুলোও সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে।

গবেষণায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতি রোহিঙ্গাদের আস্থার চিত্রও উঠে এসেছে। প্রায় ৫৬ শতাংশ বাংলাদেশ সরকারকে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। জাতিসংঘের ওপর আস্থা রয়েছে প্রায় ২১ শতাংশের। মিয়ানমার সরকারকে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন ৪ শতাংশ এবং প্রায় ১৬ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা কোনো প্রতিষ্ঠানকেই বিশ্বাস করেন না।

‘প্রত্যাবাসন হতে হবে টেকসই’

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারকে তাদের নিজভূমি হিসেবে প্রত্যাখ্যান করছে না; বরং যে পরিস্থিতি তাদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল, সেই পরিস্থিতিতে ফিরে যেতে চায় না। তাঁর মতে, শুধু সীমান্ত পার করে দিলেই প্রত্যাবাসন সফল হবে না। বাস্তুচ্যুতির মূল কারণ, অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত না হলে প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিয়ানমার অনুবিভাগের মহাপরিচালক মো. তৌফিক-উর-রহমান বলেন, টেকসই প্রত্যাবাসনের কোনো বিকল্প নেই। গবেষণাটি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মূল সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে নীতিনির্ধারকদের সহায়তা করবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মু. রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সবার আগে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণায় উঠে আসা আর্থসামাজিক সংকট, শিক্ষার ঘাটতি, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও সহিংসতার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

রোহিঙ্গা প্রতিনিধি মো. শফিক বলেন, নাগরিকত্ব, ভূমির অধিকার ও নিরাপত্তা ছাড়া প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না। তাঁরা প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার চান।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের শিবিরজীবনে রেশন কমে যাওয়া, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, শিক্ষার স্বীকৃতির অভাব ও চলাচলে বিধিনিষেধ রোহিঙ্গাদের সংকট বাড়াচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে গবেষণায়।

ক্যাটাগরি