৫০ দিন পর নিউজিল্যান্ড ফিরল এডওয়ার্ড পরিবার
সমুদ্রপথে বিশ্বভ্রমণের স্বপ্ন নিয়ে কক্সবাজারে এসেছিল নিউজিল্যান্ডের একটি পরিবার। কিন্তু নাজিরারটেক–সোনাদিয়া দ্বীপ মোহনায় তাঁদের নৌযান ‘আইল্যান্ড গার্ল’ ডুবে সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়। দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় পরিবারের ১৬ বছর বয়সী সন্তান আলবার্ট। এরপর স্ত্রী ও আরেক সন্তানকে নিয়ে প্রায় ৫০ দিন কক্সবাজারে থাকতে হয় পরিবারের প্রধান জন এডওয়ার্ডকে। এ সময়ে তাঁদের থাকা-খাওয়া ও নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) কক্সবাজার ছেড়েছে পরিবারটি। তবে হোটেলে থাকা, খাবার ও অন্যান্য সেবার বিল দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ২৪ হাজার ৬২৭ টাকা। এ বিল পরিশোধের ব্যবস্থা নিতে নিউজিল্যান্ডের হাইকমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে চিঠি পাঠিয়েছে জেলা প্রশাসন।
যেভাবে ডুবে যায় ‘আইল্যান্ড গার্ল’
গত ২৫ আগস্ট সকালে চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা শুরুর পর কক্সবাজারের নাজিরারটেক পয়েন্টের কাছে মহেশখালী চ্যানেলের মোহনায় বড় ঢেউ ও প্রবল স্রোতের মুখে পড়ে প্রায় ৫৮ ফুট দীর্ঘ কাঠের হাউসবোট ‘আইল্যান্ড গার্ল’। দুটি খোল জুড়ে তৈরি নৌযানটির দুই অংশকে সংযুক্ত রাখা কাঠের অংশগুলো ঢেউয়ের আঘাতে ভেঙে যেতে শুরু করে। একপর্যায়ে নৌযানটি দুই ভাগ হয়ে ডুবে যায়। এতে পরিবারের চার সদস্য সাগরে পড়ে যান।
কোস্ট গার্ড ও ফায়ার সার্ভিসের যৌথ অভিযানে জন এডওয়ার্ড, তাঁর স্ত্রী বেলা ও সন্তান রালফকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। নিখোঁজ ছিল ১৬ বছর বয়সী আলবার্ট। পরদিন ২৬ আগস্ট বিকেলে সমিতিপাড়া উপকূল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পরে পুলিশের উপস্থিতিতে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি এবং ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। কনস্যুলেটের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী আলবার্টের মরদেহ তাঁর বাবা জন এডওয়ার্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কক্সবাজারেই তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
সন্তান হারানোর পর বেঁচে যাওয়া পরিবারের তিন সদস্যের আশ্রয়, খাবার ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এবং জেলা পুলিশের নিরাপত্তায় তাঁদের রাখা হয় বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্স হোটেল শৈবালে। সেখানে ১০৪ নম্বর কক্ষে অবস্থান করছিলেন তাঁরা।
প্রায় ৫০ দিন ধরে পরিবারটির নিরাপত্তায় নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন পুলিশ সদস্যরা। প্রতিদিন দুজন পুলিশ সদস্য সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টা করে দায়িত্ব পালন করতেন। বুধবার ছিল তাঁদের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের শেষ দিন। এদিন দায়িত্বে ছিলেন নায়েক রাহাত ও কনস্টেবল আবদুল কাদের।
নায়েক রাহাত বলেন, পরিবারের সদস্যরা কোথায় যাচ্ছেন, বাইরে কেন বের হচ্ছেন—এসব বিষয়ে খেয়াল রেখে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হতো।
হোটেল বিল ৪ লাখ ২৪ হাজার ৬২৭ টাকা
জেলা প্রশাসনের ১৩ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৬ আগস্ট থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত হোটেল শৈবালে পরিবারের সদস্যদের থাকা, রাত্রিযাপন ও খাবার বাবদ মোট বিল হয়েছে ৪ লাখ ২৪ হাজার ৬২৭ টাকা। হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮ হাজার ৪৯৩ টাকা।
বিলের মধ্যে এসি ডিলাক্স কক্ষের ভাড়া ২০ শতাংশ ছাড়ের পর ২ লাখ টাকা, খাবারের বিল ২ লাখ ২১ হাজার ৫০৭ টাকা এবং লন্ড্রি বাবদ ৩ হাজার ১২০ টাকা। হোটেল কর্তৃপক্ষ বিল পরিশোধের জন্য নিউজিল্যান্ডের হাইকমিশনের কনস্যুলার অ্যান্ড প্রপার্টি কর্মকর্তা মিস নাদিসা ফার্নান্দোর কাছে চিঠি পাঠিয়েছে।
জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদনে বিল পরিশোধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানোর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
বিদায়ের আগে হোটেলকর্মীদের সঙ্গে ছবি, পেলেন দেশীয় উপহার
বুধবার দুপুরে হোটেল শৈবালের সাগরিকা রেস্তোরাঁয় খাবার খান পরিবারের সদস্যরা। এ সময় রেস্তোরাঁর কর্মীদের সঙ্গে ছবি তোলেন এবং তাঁদের কাছ থেকে বিদায় নেন। পরে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের বিদায় জানান। হোটেল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পরিবারটিকে দেশীয় পণ্য উপহার দেওয়া হয়।
তাসনীম জাহান বলেন, জেলা প্রশাসন ও হোটেল শৈবালের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ তাঁদের থাকা-খাওয়া ও নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভাল করেছে। গত ৭ অক্টোবর তাঁদের দেশে ফেরার কথা থাকলেও ভিসা, পাসপোর্ট ও বিমানের টিকিটসংক্রান্ত জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি। পরে নিউজিল্যান্ডের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে বুধবার তাঁদের ফেরার ব্যবস্থা করা হয়। যেসব বিষয় এখনো সমাধান হয়নি, সেগুলো দূতাবাসকে জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
হোটেল শৈবালের ব্যবস্থাপক রায়হান উদ্দিন আহমেদ বলেন, পুলিশ, জেলা প্রশাসন ও পর্যটন করপোরেশন সমন্বিতভাবে পরিবারটির দেখভাল করেছে। দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকায় তাঁদের সঙ্গে হোটেলকর্মীদের আন্তরিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। বিদায়ের সময় হোটেলের পক্ষ থেকে তাঁদের দেশীয় পণ্য উপহার দেওয়া হয়।
তিনি জানান, বুধবার বিকেল ৩টায় পরিবারটি হোটেল কক্ষ ছেড়ে দেয়। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে পর্যটন করপোরেশনের গাড়িতে করে তাঁরা কক্সবাজার বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হন। বিকেল সাড়ে ৪টার ফ্লাইটে ঢাকার উদ্দেশে কক্সবাজার ছাড়েন তাঁরা।
দুই বছর ধরে তৈরি হয়েছিল ‘আইল্যান্ড গার্ল’
নিউজিল্যান্ডের নাগরিক জন এডওয়ার্ড ও তাঁর পরিবারের বিশ্বভ্রমণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল ‘আইল্যান্ড গার্ল’। পরিবারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কক্সবাজারের স্থানীয় কারিগরদের সহযোগিতায় নৌযানটি নির্মাণে প্রায় দুই বছর সময় লাগে।
স্থানীয় বিএনপি নেতা দিদারুল ইসলাম রুবেলের ভাষ্য অনুযায়ী, নৌযানটিতে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষ, ফ্রিজ ও রান্নাঘরসহ বিভিন্ন সুবিধা ছিল। ব্যক্তিগত অ্যাডভেঞ্চার ও সমুদ্রভ্রমণের উপযোগী করে এটি তৈরি করা হয়েছিল। নৌযানটির নির্মাণব্যয় এক কোটি টাকার বেশি বলে ধারণা করা হয়। দুর্ঘটনার পর এটি কক্সবাজারের নুনিয়াছড়া বিআইডব্লিউটিএ ঘাটে ডুবে রয়েছে।
নৌকাডুবির আগেও ডাকাতির কবলে পড়েছিল পরিবারটি
নৌকাডুবির কয়েক মাস আগেও বিপদের মুখে পড়েছিল নিউজিল্যান্ডের পরিবারটি। চলতি বছরের ৮ এপ্রিল রাতে সোনাদিয়া চরে তাঁদের ওপর হামলা চালায় একদল দুষ্কৃতকারী।
পরদিন ৯ এপ্রিল কোস্ট গার্ডের গণমাধ্যম কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজনের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, জন এডওয়ার্ড পরিবার নিয়ে সমুদ্রপথে বিশ্বভ্রমণের উদ্দেশ্যে ২০২৪ সালে পর্যটক ভিসায় বাংলাদেশে আসেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, তাঁরা নিজেদের কাঠের নৌযানে সমুদ্রযাত্রা করছিলেন।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, নিরাপত্তাঝুঁকি পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড পরিবারটিকে এ ধরনের সমুদ্রযাত্রা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছিল। ১ মার্চ তাঁদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নির্দেশনাও দেওয়া হয়। তবে বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা উপেক্ষা করে তাঁরা সোনাদিয়া চরে নৌযানসহ অবস্থান করছিলেন। হামলার খবর পেয়ে কোস্ট গার্ডের একাধিক দল অভিযান চালিয়ে পরিবারের সদস্যদের উদ্ধার করে।