কক্সবাজারে থাকবে না কিশোর গ্যাং : সন্ধ্যার পর অকারণে রাস্তায় পাওয়া গেলে গ্রেপ্তারের হুঁশিয়ারি
নারী-শিশু নির্যাতন ও সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা ডিআইজির
কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, মাদকাসক্তি এবং বহুমাত্রিক সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী। অপরাধপ্রবণতা নিয়ন্ত্রণে কক্সবাজারে কোনো কিশোর গ্যাং থাকতে দেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে সন্ধ্যার পর স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের রাস্তায় পাওয়া গেলে তাদের বাইরে থাকার উপযুক্ত কারণ জানতে চাওয়া হবে। সন্তোষজনক কারণ দেখাতে ব্যর্থ হলে গ্রেপ্তারের কথাও জানিয়েছেন তিনি। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর অভিভাবকদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
শুধু কিশোর অপরাধ নয়, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা এবং সমাজে সংঘটিত নানা অপরাধ প্রতিরোধেও পুলিশ কঠোর ভূমিকা পালন করবে বলে জানান ডিআইজি। তাঁর বক্তব্যে অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক নেতৃত্বের সম্মিলিত দায়িত্বের বিষয়টিও উঠে আসে।
গতকাল শনিবার (৩১ অক্টোবর) কক্সবাজারে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ এবং সামাজিক অপরাধ দমনবিষয়ক এক সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী বলেন, কক্সবাজারে কোনো কিশোর গ্যাং থাকবে না। কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া ঠেকাতে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কী করছে এবং সন্ধ্যার পর কেন বাইরে থাকছে এসব বিষয়ে অভিভাবকদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখতে হবে। অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগেই তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের নামে কোনো ধরনের অপরাধ, বিশৃঙ্খলা কিংবা জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না। অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থানে থাকবে।
তবে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধের বিষয়টিও সমাবেশে বিশেষ গুরুত্ব পায়। এ সময় নারী ও শিশু নির্যাতন, মাদকাসক্তি, কিশোর অপরাধ এবং অন্যান্য সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর জোর দেন ডিআইজি।
তিনি বলেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে এসব অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব নয়। অপরাধ প্রতিরোধে অভিভাবক, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দসহ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। পরিবার থেকেই সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা, দায়িত্ববোধ ও অপরাধ সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে।
বিশেষ করে কিশোরদের অপরাধপ্রবণতা রোধে পারিবারিক নজরদারি এবং সামাজিক সচেতনতার বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমাজের প্রতিটি স্তরে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
এদিকে পর্যটননগরী কক্সবাজারে অপরাধের ধরন ও বিস্তৃতি বহুমাত্রিক উল্লেখ করে সভায় বক্তারা বলেন, এ শহরের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন। জেলা পুলিশ সম্প্রতি অপরাধ দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। এসব উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে একযোগে কাজ করতে হবে।
তাঁরা বলেন, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, কিশোর অপরাধ, মাদকাসক্তি কিংবা জননিরাপত্তাবিঘ্নকারী কর্মকাণ্ড কোনো অপরাধই বিচ্ছিন্নভাবে মোকাবিলা করার সুযোগ নেই। অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা তৈরি, পরিবারে দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত এবং আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে হবে।
পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য রাখেন পৌর বিএনপির সভাপতি রফিকুল হুদা চৌধুরী, সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মাবুদ, কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সভাপতি মাহবুবর রহমান এবং জেলা শ্রমিকদলের সভাপতি রফিকুল ইসলাম।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ সুধী সমাবেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
তবে সচেতন মহল বলছেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং সামাজিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ডিআইজির এ ঘোষণা কক্সবাজারে অপরাধ প্রতিরোধের আলোচনাকে নতুন করে সামনে এনেছে। এখন এ ঘোষণার বাস্তব প্রয়োগ, অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশের কার্যক্রম এবং সামাজিক অংশীজনদের দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপরই নির্ভর করবে উদ্যোগগুলোর কার্যকারিতা। কক্সবাজারবাসীর প্রত্যাশা, অপরাধমুক্ত ও নিরাপদ জনপদ গড়তে এ উদ্যোগ ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে কার্যকর পদক্ষেপে রূপ নেবে।