বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতার তালিকায় শত শত মৃত ব্যক্তির নাম!
কক্সবাজার সদর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতার তালিকায় শত শত মৃত ব্যক্তির নাম থাকার অভিযোগ উঠেছে। বছরের পর বছর এসব ব্যক্তির নামে সরকারি বরাদ্দ চলমান থাকলেও তালিকা হালনাগাদ ও অর্থ বিতরণে কার্যকর তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। এ ঘটনায় কক্সবাজার সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা কৌশিক খানের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে।
জানা যায়, কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল, ঝিলংজা, পিএমখালী, চৌফলদণ্ডী ও ভারুয়াখালী ইউনিয়নের বিভিন্ন সরকারি ভাতাভোগীর তালিকায় মৃত ব্যক্তিদের নাম রয়ে গেছে বছরের পর বছর। দীর্ঘদিন আগে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। ফলে এসব ব্যক্তির নামে বরাদ্দ করা সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। উল্লেখ্য যে, এবিষয়ে প্রতিবেদকের তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি জানতে পেরে তড়িঘড়ি করে এক সপ্তাহ পূর্বে বিভিন্ন ইউনিয়নে তালিকা প্রেরণ করে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা।
অভিযোগ রয়েছে, তালিকায় থাকা অনেক ব্যক্তির নামের পাশে উল্লেখ করা অনেক মোবাইল নম্বরও বন্ধ রয়েছে। আবার কয়েকটি নম্বরে যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির স্বজনেরা জানান, তালিকায় থাকা তাঁদের দাদা-দাদি, মা-বাবা, কিংবা স্বামী-স্ত্রী অনেক আগেই মারা গেছেন। কিছু কিছু নাম্বারে টাকা আসার কথা বললেও অনেকে ওই নম্বরে ভাতার টাকা আসছে না বলে জানায় তাঁরা।
ভাতার তালিকায় মৃত ব্যক্তির নাম বছরের পর বছর রয়ে যাওয়ার বিষয়ে সদর উপজেলার খুরুশকুল ইউনিয়নে দায়িত্বরত মাঠকর্মী আফতাব উদ্দিন, চৌফলদন্ডী ইউনিয়নে দায়িত্বরত মাঠকর্মী শিমুল মিত্র, ঝিলংজা, পিএমখালী ও ভারুয়াখালী ইউনিয়নে দায়িত্বরত মাঠকর্মী চঞ্চলা পালের সাথে কথা হয় প্রতিবেদকের। তারা বলেন- বিভিন্ন ভাতার তালিকায় মৃত ব্যক্তির নাম রয়ে গেছে সেটি সত্য। তবে মোট কতজন মৃত ব্যক্তি আছে তা জানা নেই। একপর্যায়ে তারা বলেন, মৃত ব্যক্তিদের নাম দিতে যাচাই-বাছাই করার জন্য এক সপ্তাহ আগে প্রত্যেক ইউনিয়নে তালিকা দেওয়া হয়েছে।
সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে দায়িত্বরত চেয়ারম্যানদের সাথে কথা হয় প্রতিবেদকের। তাঁরা জানান, “বিভিন্ন ভাতার তালিকায় মৃত ব্যক্তিদের নাম থাকার বিষয়টি সত্য। মূলত সমাজসেবা অফিসের অবহেলার কারণে নামগুলো এখনো রয়ে গেছে। আমরা কোন ভাতার তালিকায় নাম যোগ করতেও পারি না, আবার বাদও দিতে পারি না। এটি পুরোটা সমাজসেবা কর্মকর্তার এখতিয়ার”।
এ বিষয়ে জানার জন্য উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা কৌশিক খানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন-“আপনারা ভাতার তালিকা কোথায় পেয়েছেন? তালিকা তো আমার কম্পিউটারের বাহিরে যাওয়ার কথা না”। মৃত ব্যক্তিদের বিষয়ে তিনি বলেন-“তালিকায় মৃত ব্যক্তিদের নাম থাকতে পারে, তবে মোট কত জন সেটি আমার জানা নেই। কারণ মৃত ব্যক্তিদের সনাক্ত করা আমার দায়িত্ব না, সেটি ইউনিয়ন কমিটির দায়িত্ব। আর ঐ কমিটির সভাপতি হল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। তারা মৃত ব্যক্তিদের সনাক্ত করে মৃত্যু সনদ দিলে আমরা বাদ দিতে পারি, এর আগে বাদ দিতে পারি না”। মৃত ব্যক্তিদের এতদিন সনাক্ত না করার বিষয়ে তিনি বলেন-“আমাদের জনবল কম, অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে ইউনিয়ন চালাতে হচ্ছে। তাই মৃত ব্যক্তিদের সনাক্ত করতে বিলম্ব হচ্ছে”। তিনি আরো বলেন- “এক সপ্তাহ আগে মৃত ব্যক্তিদের সনাক্ত করে মৃত্য সনদ দেওয়ার জন্য প্রত্যেক ইউনিয়নে চিঠি দেওয়া হয়েছে। মৃত ব্যক্তিদের মৃত্যু সনদ পাওয়া গেলে তাদেরকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে।
সরকারি ভাতার তালিকায় শত শত মৃত ব্যক্তিদের নাম রয়ে যাওয়ার বিষয়টি দায়িত্বে অবহেলা কিনা? জানতে চাইলে কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার বলেন-“এটি অবশ্যই দায়িত্বে অবহেলা, মাঠকর্মী থাকার পরেও কেন সরকারি ভাতার তালিকায় মৃত ব্যক্তিদের নাম থাকবে। বিষয়টি আপনার মাধ্যমে জানলাম মাত্র। উক্ত বিষয়ে সমাজসেবা কর্মকর্তার সাথে কথা বলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে”।
এমন পরিস্থিতিতে মৃত ব্যক্তিদের নামে বরাদ্দ করা অর্থ প্রকৃতপক্ষে কোথায় যাচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তালিকায় মৃত ব্যক্তিদের নাম থাকার অর্থ এই নয় যে তাঁদের নামে বরাদ্দ করা অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে, তবে প্রকৃত ভাতাভোগী, অর্থ বিতরণের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট মোবাইল আর্থিক হিসাব যাচাই করে বিষয়টি পরিষ্কার করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।