ভেনেজুয়েলার পর এবার ট্রাম্পের নিশানায় যে ৫ দেশ
ডনরো ডকট্রিন’: ট্রাম্পের নতুন আধিপত্যবাদী দর্শনে অস্থির বিশ্ব রাজনীতি
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে আটক করার নাটকীয় ঘটনার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে এক নতুন ও আগ্রাসী অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। ১৮২৩ সালের ঐতিহাসিক ‘মনরো ডকট্রিন’-এর আদলে তিনি ঘোষণা করেছেন নিজের নতুন কৌশলগত দর্শন—‘ডনরো ডকট্রিন’ (Donroe Doctrine)। এই নীতির মূল লক্ষ্য হলো পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র প্রভাব ও আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
এই নীতির বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ভেনেজুয়েলার পর বিশ্বের আরও অন্তত পাঁচটি দেশ ও অঞ্চল এখন ট্রাম্প প্রশাসনের বিশেষ নজরদারিতে রয়েছে—যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
গ্রিনল্যান্ড: নতুন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্র
ডনরো ডকট্রিনের তালিকার শীর্ষে রয়েছে ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড। বিরল খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ এবং উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বীপকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ‘অপরিহার্য’ বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে রাশিয়া ও চীনের জাহাজ চলাচল বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। তবে গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স ফ্রেডরিক নিলসেন ও ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডরিকসেন এই প্রস্তাবকে ‘অবাস্তব ও অগ্রহণযোগ্য’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবুও ট্রাম্পের অনমনীয় অবস্থান ন্যাটোর অভ্যন্তরেই নতুন টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে।
কলম্বিয়া: দীর্ঘদিনের মিত্রে ফাটল
দক্ষিণ আমেরিকায় ট্রাম্পের পরবর্তী লক্ষ্য হিসেবে উঠে এসেছে কলম্বিয়ার নাম। ভেনেজুয়েলা অভিযানের পর কলম্বিয়ার বামপন্থি প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে প্রকাশ্যে হুঁশিয়ারি দিয়ে ট্রাম্প বলেন, নিজের নিরাপত্তা নিয়ে তাঁর ভাবা উচিত। ট্রাম্পের অভিযোগ, পেত্রো যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করছেন। কলম্বিয়ায় সামরিক অভিযান চালানো হতে পারে কি না—এমন প্রশ্নে ট্রাম্পের ইতিবাচক সাড়া দুই দেশের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্ককে গুরুতর সংকটে ফেলেছে।
ইরান: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আশঙ্কা
মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের কড়া নজর এখন ইরানের দিকে। দেশটিতে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে যদি শক্তি প্রয়োগ করা হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করবে—এমন স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের পর ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় সম্ভাব্য হামলার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে, যা পুরো অঞ্চলকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে।
মেক্সিকো: সীমান্তে সামরিক হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত
প্রতিবেশী দেশ মেক্সিকোর ক্ষেত্রেও ট্রাম্পের অবস্থান ক্রমেই কঠোর হচ্ছে। মাদক পাচার ও অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে তিনি সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না। ক্ষমতায় ফিরেই ‘মেক্সিকো উপসাগর’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘আমেরিকা উপসাগর’ রাখার নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করে তিনি প্রতীকীভাবে নিজের আধিপত্যবাদী মনোভাব স্পষ্ট করেছেন।
কিউবা: পতনের অপেক্ষায় ওয়াশিংটন
সবশেষে ট্রাম্পের নজর কিউবার দিকে। তাঁর দাবি, ভেনেজুয়েলার তেল সহায়তার ওপর নির্ভরশীল কিউবার অর্থনীতি ইতোমধ্যে ভঙ্গুর অবস্থায় পৌঁছেছে। মাদুরোর পতনের পর কিউবার কমিউনিস্ট সরকারও স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল হয়ে পড়বে—এমন ধারণা থেকে আপাতত সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না তিনি। তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কিউবাকে স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের হুঁশিয়ারিকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
ডনরো ডকট্রিন ঘোষণার পর ল্যাটিন আমেরিকা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে—তা নিয়ে গভীর শঙ্কা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।