সোমবার, ১০ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৬শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রামু

বর্ষা এলেই জীবন-মৃত্যুর লড়াই!

কক্সবাজারের রামু উপজেলা সদরের চৌমুহনী স্টেশন থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে বাকঁখালী নদী। নদীর ওপারে ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের দ্বীপ শ্রীকুল ও ফুলনীরচর গ্রাম। দুই গ্রামে বসবাস প্রায় দুই হাজার পরিবারের। অথচ যুগের পর যুগ পেরিয়ে গেলেও নদীর ওপর নির্মাণ হয়নি একটি স্থায়ী সেতু।

ফলে নদী পারাপারে নৌকা আর ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকোই তাদের একমাত্র ভরসা। বর্ষা এলেই সেই ভরসাও হয়ে ওঠে আতঙ্কের কারণ। টানা বৃষ্টি কিংবা পাহাড়ি ঢলে বাকঁখালী নদীর পানি বাড়লে উত্তাল স্রোত পেরিয়ে নৌকায় চলাচল করতে হয় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীদের। কখনো নদী এতটাই উত্তাল হয়ে ওঠে যে নৌকা চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়। তখন ভাঙা সাঁকো কিংবা কলাগাছের ভেলায় নদী পার হওয়ার ঝুঁকি নিতে হয় স্থানীয়দের।

স্থানীয়দের দাবি, ভারী পাহাড়ি ঢলের সময় নৌকায় নদী পারাপারের ক্ষেত্রে প্রায় ২০ জন ভেসে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তাদের অভিযোগ, রামু শহরের এত কাছে বসবাস করেও একটি সেতুর অভাবে তারা কার্যত বিচ্ছিন্ন জনপদের মানুষের মতো জীবনযাপন করছেন।

নদীর ওপারের শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন স্কুলে যেতে হয় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। রামুর খিজারী স্কুলের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন বলেছেন, সপ্তাহে ছয় দিন স্কুলে যেতে হয় তাদের। ভারী বৃষ্টির সময় নৌকায় করে নদী পার হতে ভয় লাগে। অনেক সময় জুতা হাতে নিয়ে নৌকায় উঠতে হয়। নদী পার হওয়ার সময় বই-খাতা ও কাপড় ভিজে গেলে সেদিন আর স্কুলে যাওয়া সম্ভব হয় না।

শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি প্রতিদিন কর্মজীবী মানুষ ও সাধারণ যাত্রীদেরও একইভাবে নৌকার ওপর নির্ভর করতে হয়।


দুই গ্রামের মানুষের যাতায়াতের এই সংকটের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ৭২ বছর বয়সী খুইল্যা মিয়ার জীবন। দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে তিনি বাকঁখালী নদীতে নৌকা চালাচ্ছেন। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়লেও সকাল থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত মানুষকে নদী পারাপার করে চলেছেন তিনি।

জনপ্রতি মাত্র ১০ টাকা ভাড়া নেন খুইল্যা মিয়া। স্থানীয়দের হিসাবে, প্রতিদিন তার নৌকায় ৩০০ থেকে ৪০০ মানুষ নদী পার হন। তাদের বড় একটি অংশ স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী।

তবে খুইল্যা মিয়াও চান, তার নৌকার ওপর মানুষের এই নির্ভরতার অবসান হোক। তার ভাষায়, নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতু হলে মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ আর থাকবে না।


সেতুর অভাবে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়তে হয় জরুরি চিকিৎসার সময়। স্থানীয় শিক্ষক রিকন বড়ুয়া বলেছেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি এই এলাকার মানুষের দুর্ভোগ দেখে আসছেন। কোনো মা-বোন অসুস্থ হলে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না। অনেক সময় নৌকায় নদী পারাপারও কঠিন হয়ে পড়ে। তখন কলাগাছের ভেলা কিংবা সাঁকোর ওপর দিয়েই রোগী নিয়ে যেতে হয়।

তার দাবি, চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়ার পথে অনেক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, গুরুতর অসুস্থ রোগী, শিশু ও বয়স্কদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। রাতের বেলায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

৬৫ বছর বয়সী ফাতেমা বিবির জীবনেও এই দুর্ভোগ নিত্যসঙ্গী। দ্বীপ শ্রীকুলে জন্ম নেওয়া এই বৃদ্ধা বলেন, জীবনের শেষ বয়সেও ভারী বর্ষণের মধ্যে চিকিৎসার জন্য নৌকায় করে নদী পার হতে হয়। শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে নদী পারাপারের ভয়ও মোকাবিলা করতে হয় তাকে।

তার ভাষ্য, প্রতিদিন শত শত মানুষ চিকিৎসার প্রয়োজনে এভাবে নদী পার হন। বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের নৌকায় করে হাসপাতালে নেওয়ার সময় পরিবারের সদস্যদের চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে থাকতে হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রামু উপজেলার প্রাণকেন্দ্রের এত কাছে থেকেও দ্বীপ শ্রীকুল ও ফুলনীরচরের বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। একটি সেতুর অভাবে শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন যাতায়াত, সব ক্ষেত্রেই তাদের বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষিপণ্য বাজারজাত করা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আনা-নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। বর্ষাকালে নদীর পানি বাড়লে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়।

ফতেখাঁরকুল ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন বললেন, দীর্ঘদিন ধরে দ্বীপ শ্রীকুল ও ফুলনীরচরের মানুষ সাঁকো ও নৌকার ওপর নির্ভর করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলাচল করছেন। মানুষের এই দুর্দশা তিনি নিজেও দেখেছেন। দুই গ্রামের মানুষের সুবিধার্থে দ্রুত বাকঁখালী নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণে সরকারের প্রতি আবেদন জানান তিনি।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, আর প্রতিশ্রুতি নয়। দুই হাজার পরিবারের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে দ্রুত বাকঁখালী নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তাদের কাছে সেতুটি শুধু যোগাযোগের অবকাঠামো নয়, বরং বর্ষায় জীবন বাঁচানোর অন্যতম নিরাপদ পথ।

ক্যাটাগরি