কক্সবাজার জেলা

শীতের হাওয়ায় বদলে গেছে কক্সবাজার সৈকত, বাড়ছে পর্যটকের ভিড়

শীতের আগমনী হাওয়ায় বদলে যেতে শুরু করেছে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের চিত্র। এক সপ্তাহ আগেও যেখানে ছিল উত্তাল ঢেউ, এখন সেখানে তুলনামূলক শান্ত সাগর। কমেছে ঢেউয়ের তীব্রতা, স্বচ্ছ হয়ে উঠছে জলরাশি। এর সঙ্গে ধীরে ধীরে বাড়ছে পর্যটকের আনাগোনাও।

শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে কলাতলী পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার সৈকতে দেখা গেছে পর্যটকদের সরব উপস্থিতি। কেউ বালুচরে হাঁটছেন, কেউ ছবি তুলছেন, আবার কেউ ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সব মিলিয়ে সৈকতজুড়ে ছিল উৎসবের আমেজ।

সুগন্ধা পয়েন্টে চার বান্ধবী মেহজাবিন, তানহা, নীলা ও মিতুকে আনন্দে মেতে থাকতে দেখা যায়। মেহজাবিন ও তানহা একে অন্যের ছবি তুলছিলেন। আর নীলা ও মিতু ঘোড়ায় চড়ে বালুচরের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত ঘুরছিলেন।

মেহজাবিন বলেন, ‘শহুরে জীবন অনেক ক্লান্তিকর ও একঘেয়ে। সারাদিন বিল্ডিং আর ক্লাসের ব্যস্ততার পর বাসায় ফেরাই যেন রুটিন। কিন্তু কক্সবাজারে এলে সমুদ্রের গর্জন, মানুষের কোলাহল আর প্রকৃতির সৌন্দর্য মিলিয়ে এক অন্যরকম অনুভূতি হয়।’

তিনি বলেন, কক্সবাজারে এটি তাঁর প্রথম ভ্রমণ নয়। যতবারই এসেছেন, সমুদ্রের গর্জন তাঁকে মুগ্ধ করেছে। ব্যস্ত জীবনের বাইরে প্রকৃতির কাছে ফিরে আসার এক ধরনের প্রশান্তি খুঁজে পান তিনি।

ঘোড়ায় চড়া ও ছবি তোলার পর মিতু বলেন, ছোটবেলায় ঘোড়ায় উঠলেও তখন ভয় লাগত। এবার আবার ঘোড়ায় উঠে তেমন ভয় লাগেনি, বরং ভালো লেগেছে। ঘোড়াটিকেও তাঁর বন্ধুর মতো মনে হয়েছে। ঘোড়ার মালিকেরা যেন প্রাণীগুলোর যথাযথ যত্ন নেন এবং খাবারের ব্যবস্থা করেন, সেই প্রত্যাশাও জানান তিনি।

মিতু বলেন, ‘এখনো সাগরে নামিনি। সাগরে যাওয়ার পর আরও ভালো লাগবে বলে মনে হচ্ছে। সব মিলিয়ে বেশ মজা করছি।’

এক সপ্তাহেই বদলে গেল সৈকতের চিত্র

গত সপ্তাহেও কক্সবাজারের সমুদ্র ছিল উত্তাল। উপকূলে আছড়ে পড়ছিল বড় বড় ঢেউ। সেই ঢেউয়ের সঙ্গে আনন্দে মেতেছিলেন পর্যটকেরা। এক সপ্তাহের ব্যবধানে বদলে গেছে সেই চিত্র। এখন সাগর তুলনামূলক শান্ত, কমেছে ঢেউয়ের তীব্রতা, স্বচ্ছ হয়ে উঠছে জলরাশি।

পর্যটকেরা মনে করছেন, প্রকৃতির এই পরিবর্তন শীতের আগমনী বার্তা দিচ্ছে। শীতের টানেই ধীরে ধীরে বাড়ছে ভ্রমণপিপাসু মানুষের আনাগোনা। ছুটির দিনে বিশেষ করে সুগন্ধা, লাবণী ও কলাতলী পয়েন্টে দেখা যাচ্ছে বাড়তি ভিড়।

ঢাকার উত্তরা থেকে স্ত্রী, সন্তান ও বন্ধুদের নিয়ে কক্সবাজারে এসেছেন নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন, শহরের ব্যস্ততা ও ক্লান্তি থেকে স্বস্তি পেতে কক্সবাজারে আসেন। প্রিয়জনদের সঙ্গে এখানে সময় কাটানোর অনুভূতি আলাদা। এবারই প্রথম স্ত্রী ও সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন।

নাসির উদ্দিন বলেন, ‘বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত হওয়ায় কক্সবাজারের প্রতি আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। বন্ধুদেরও সঙ্গে পেয়েছি সব মিলিয়ে খুবই ভালো লাগছে।’

একই এলাকার পর্যটক ফারজানা ইয়াসমিন বলেন, ঢাকা থেকে প্রায় নয় ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রায় তিনি অনেকটাই ক্লান্ত ছিলেন। তবে সাগর দেখার পর সেই ক্লান্তি মুহূর্তেই দূর হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, ‘বিশাল সমুদ্রের ঢেউ আর সৌন্দর্য দেখে মনটা শান্ত হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে কক্সবাজার এসে খুবই ভালো লাগছে।’

নিরাপত্তায় সতর্ক লাইফগার্ড

সাগর শান্ত হলেও সৈকতের কয়েকটি এলাকায় বালুচরে গর্ত তৈরি হয়েছে। জোয়ারের সময় এসব গর্তে পানি জমে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। পর্যটকদের সতর্ক করতে মাইকিংয়ের পাশাপাশি তৎপর রয়েছে লাইফগার্ড ও ট্যুরিস্ট পুলিশ।

সী সেফ লাইফগার্ড সংস্থার ইনচার্জ মোহাম্মদ শুক্কুর বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তায় তাঁদের একটি দল সার্বক্ষণিক মাইকিং করছে। কোথায় গোসল নিরাপদ, বিপদের সময় কীভাবে লাইফগার্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে এসব বিষয়ে পর্যটকদের জানানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, লাইফগার্ডরা সরাসরি পর্যটকদের বুঝিয়ে দিচ্ছেন কোন এলাকায় গোসল নিরাপদ এবং কোন এলাকায় ঝুঁকি রয়েছে।

মোহাম্মদ শুক্কুর বলেন, ‘যারা আমাদের নির্দেশনা মেনে চলছেন, তাঁরা নিরাপদে থাকছেন। কিন্তু যারা সতর্কবার্তা উপেক্ষা করছেন, তাঁরাই বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন। তাই পর্যটকদের অনুরোধ করব, সবসময় লাইফগার্ডের নজরদারির আওতায় থাকুন এবং তাঁদের নির্দেশনা মেনে চলুন।’

পর্যটন ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, শীত যত বাড়বে, কক্সবাজারে পর্যটকের ভিড়ও তত বাড়বে। পর্যটকের আনাগোনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শীতের মৌসুমে সৈকত ও পর্যটনকেন্দ্রগুলো আরও জমজমাট হয়ে উঠবে এমনটাই আশা তাঁদের।

ক্যাটাগরি