কক্সবাজার জেলা

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জন, পর্যটক, দর্শনার্থী ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ঢল

সমুদ্রে জনসমুদ্র, বিসর্জনে সম্প্রীতি ও কল্যাণের বার্তা

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে তখন বিকেলের সোনালি আলো। দিনের উত্তাপ কিছুটা কমে এসেছে। পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে ক্লান্ত সূর্য। একদিকে নীল জলরাশি, অন্যদিকে মানুষের ঢল—সব পথ যেন এসে মিশেছে সৈকতের লাবণী পয়েন্টে। ঢাক-ঢোল, কাঁসর-ঘণ্টা আর ভক্তদের জয়ধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো সৈকত। আনন্দ, আবেগ আর বিদায়ের বিষাদমাখা এক অনন্য পরিবেশে সাগরের জলে বিসর্জন দেওয়া হয়েছে দেবী দুর্গার প্রতিমা। এর মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।

বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমী উপলক্ষে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী পয়েন্টে অনুষ্ঠিত প্রতিমা বিসর্জনকে ঘিরে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একে একে প্রতিমা নিয়ে আসতে শুরু করেন পূজামণ্ডপের আয়োজক, ভক্ত ও পূণ্যার্থীরা। দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। বিকেলের দিকে লাবণী পয়েন্ট পরিণত হয় এক বিশাল জনসমুদ্রে।

পর্যটক, দর্শনার্থী ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উপচেপড়া ভিড়ে জনসমুদ্রে পরিণত হয় কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী পয়েন্ট। বুধবার দুপুর থেকেই জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিমা নিয়ে আসতে শুরু করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পর্যটক ও স্থানীয় দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো সৈকত। বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। ঢাক-ঢোল, কাঁসর-ঘণ্টা, উলুধ্বনি আর ‘জয় মা দুর্গা’ ধ্বনিতে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে সৈকতের পরিবেশ। সমুদ্রের ঢেউ আর অস্তগামী সূর্যের অপরূপ পটভূমিতে প্রতিমা বিসর্জনের এই দৃশ্য উপভোগ করতে সৈকতের বিভিন্ন স্থানে ভিড় করেন হাজারো মানুষ। ধর্মীয় আবেগ, উৎসবের আনন্দ ও পর্যটকদের উচ্ছ্বাসে লাবণী পয়েন্ট পরিণত হয় এক বিশাল জনসমুদ্রে।

বিদায়ের সুরে আনন্দ-আবেগের মিলন

সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দুর্গাপূজার দিনগুলোতে দেবী দুর্গা মর্ত্যে আগমন করেন। পূজা, আরাধনা ও নানা আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিজয়া দশমীতে তাঁকে বিদায় জানানো হয়। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী ফিরে যান কৈলাসে। তাই বিসর্জনের মুহূর্তটি একদিকে যেমন উৎসবের সমাপ্তি, অন্যদিকে তেমনি ভক্তদের কাছে গভীর আবেগ ও ভালোবাসার প্রকাশ।

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতেও সেই চিরচেনা আবেগের প্রতিফলন দেখা গেছে। প্রতিমা নিয়ে সৈকতে পৌঁছানোর পর ভক্তদের অনেকেই বাদ্যের তালে তালে নাচ-গানে মেতে ওঠেন। কেউ উলুধ্বনি দেন, কেউ শঙ্খ বাজান, আবার কেউ ‘জয় মা দুর্গা’ ধ্বনিতে মুখর করে তোলেন চারপাশ। প্রতিমা বিসর্জনের সময় অনেকের চোখেমুখে ছিল আনন্দের উচ্ছ্বাস, আবার দেবীকে বিদায় জানানোর মুহূর্তে ফুটে ওঠে আবেগ ও বিষাদের ছাপ।

সমুদ্রের ঢেউ আর অস্তগামী সূর্যের পটভূমিতে প্রতিমা বিসর্জনের এই দৃশ্য যেন এক অনন্য আবহ তৈরি করে। সৈকতের বালুচরে দাঁড়িয়ে কেউ উপভোগ করেছেন পুরো আয়োজন, কেউ মুঠোফোনে ধারণ করেছেন স্মরণীয় মুহূর্ত। দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছেও এই আয়োজন হয়ে ওঠে কক্সবাজার ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ।

পর্যটকদের চোখে ব্যতিক্রমী আয়োজন

বিসর্জন উৎসব দেখতে আসা পর্যটকদের মধ্যেও ছিল ব্যাপক উৎসাহ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মানুষ সমুদ্রসৈকতে এমন বৃহৎ ধর্মীয় আয়োজন দেখে মুগ্ধ হন।

ঢাকার নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা পর্যটক আব্দুল করিম বলেন, “এত বড় আয়োজন, এত মানুষ আর সৈকতে প্রতিমা বিসর্জন—সবকিছু মিলিয়ে দারুণ একটা মুহূর্ত উপভোগ করলাম। এমন দৃশ্য সত্যিই মনে রাখার মতো।”

ঢাকার গোপীবাগ থেকে আসা দেবব্রত সেন বলেন, “প্রথমবার এসেছি। সৈকতে প্রতিমা বিসর্জনে এত মানুষ হয়, তা জানতাম না। খুব ভালো লাগছে। এখানকার পরিবেশ ও আয়োজন সত্যিই অসাধারণ।”

পর্যটকদের মতে, কক্সবাজারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে এমন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আয়োজন যুক্ত হওয়ায় সৈকতের আকর্ষণ আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ধর্ম, শ্রেণি ও পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি এই উৎসবকে দিয়েছে সর্বজনীন মিলনমেলার রূপ।

বিসর্জনে অশুভের বিনাশ, শুভ ও কল্যাণের প্রত্যাশা

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে দুর্গাপূজা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি অন্যায়, অশুভ ও অসুরশক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ের প্রতীক। পুরাণের কাহিনি অনুসারে, দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করে দেবতাদের ও বিশ্বজগতকে অশুভ শক্তির হাত থেকে রক্ষা করেন। সেই বিশ্বাসের আলোকে দুর্গোৎসব মানুষকে সত্য, ন্যায়, সাহস ও কল্যাণের পথে চলার অনুপ্রেরণা জোগায়।

বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার সমাপ্তি ঘটলেও ভক্তদের কাছে দেবীর আদর্শ ও শিক্ষা থেকে যায় সারা বছরের জন্য। অশুভের বিনাশ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং সমাজে সত্য ও সুন্দরের প্রতিষ্ঠাই এই উৎসবের অন্যতম তাৎপর্য।

সনাতন সম্প্রদায়ের বিশ্বাস, দেবী দুর্গার বিদায় মানে কেবল প্রতিমার বিসর্জন নয়; বরং আগামী দিনের জন্য নতুন আশার সঞ্চার। ব্যক্তিজীবন ও সমাজ থেকে হিংসা, বিদ্বেষ, অন্যায় ও অকল্যাণ দূর হয়ে শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হোক—বিসর্জনের প্রার্থনায় উঠে আসে সেই প্রত্যাশাও।

দেবীর নৌকায় গমন ঘিরে সমৃদ্ধির প্রত্যাশা

শাস্ত্রীয় ও পঞ্জিকাভিত্তিক বিশ্বাস অনুযায়ী, এ বছর দেবীর আগমন ঘটেছে ঘোড়ায় এবং গমন বা বিদায় হয়েছে নৌকায়। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাসে দেবীর গমনের বাহনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শুভাশুভ ফলের ব্যাখ্যা রয়েছে।

প্রচলিত শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দেবীর নৌকায় গমনকে শস্যবৃদ্ধি, কৃষি ও উৎপাদনে সমৃদ্ধি এবং মানুষের জীবন-জীবিকায় কল্যাণের প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এই বিশ্বাসে নৌকায় দেবীর বিদায় প্রকৃতি ও মানবসমাজের জন্য শান্তি, প্রাচুর্য ও মঙ্গল বয়ে আনার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অনেকে আশা করেন, দেবীর আশীর্বাদে পৃথিবী শস্য-শ্যামলা হয়ে উঠবে, কৃষি ও উৎপাদনে সমৃদ্ধি আসবে এবং মানুষের জীবন থেকে দুঃখ-দুর্দশা দূর হবে। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, দুর্ভিক্ষ ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা কাটিয়ে দেশ ও পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক—এমন প্রার্থনাও ছিল ভক্তদের মধ্যে।

তবে এসব ফলাফল ধর্মীয় পঞ্জিকা ও প্রচলিত বিশ্বাসের অংশ; এগুলোকে নিশ্চিত প্রাকৃতিক পূর্বাভাস হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। ভক্তদের কাছে এর মূল তাৎপর্য হলো আগামী দিনের জন্য মঙ্গল, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা।

নিরাপত্তায় সতর্ক অবস্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী

বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগমকে কেন্দ্র করে প্রতিমা বিসর্জনস্থলে নিরাপত্তার বিষয়টিও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সাগরের পানিতে প্রতিমা বিসর্জনের সময় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে প্রস্তুত ছিলেন লাইফগার্ড সদস্যরা। একই সঙ্গে নিরাপত্তা জোরদার ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালন করেন ট্যুরিস্ট পুলিশ, জেলা পুলিশ এবং এসআরবি সদস্যরা।

সমুদ্রসৈকতের মতো পর্যটনকেন্দ্রে ধর্মীয় উৎসবের আয়োজন হওয়ায় মানুষের চলাচল, সমুদ্রের ঢেউ এবং পানিতে নামার বিষয়গুলোতে সতর্কতা প্রয়োজন ছিল। এ কারণে বিসর্জন ঘিরে নিরাপত্তাব্যবস্থা ও উদ্ধার প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

উৎসবের আনন্দ যেন কোনো দুর্ঘটনায় ম্লান না হয়, সে জন্য সংশ্লিষ্টদের সতর্ক অবস্থান আয়োজনের সার্বিক পরিবেশ বজায় রাখতে সহায়ক হয়।

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জন স্থানীয় সনাতন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আবেগ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে এই আয়োজন শুধু একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পর্যটননগরী কক্সবাজারে দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষের উপস্থিতি বিসর্জন উৎসবকে দেয় বৃহত্তর সামাজিক তাৎপর্য।

বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের পাশাপাশি অবস্থান, একে অপরের উৎসব প্রত্যক্ষ করা এবং আনন্দ ভাগাভাগি করার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের পরিবেশ। এমন আয়োজন মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হলেও আনন্দ, ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও শান্তির প্রত্যাশা সবারই অভিন্ন।

বিজয়া দশমীর এই বিসর্জন তাই কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার সমাপ্তি নয়; এটি সামাজিক সম্প্রীতি, মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনারও প্রতীক। উৎসবের এই মিলনমেলা মানুষের মধ্যে বিভেদ নয়, বরং পারস্পরিক সহযোগিতা ও সৌহার্দ্যের বন্ধন আরও দৃঢ় করার বার্তা বহন করে।

অস্তগামী সূর্যের আলোয় শেষ হয় দুর্গোৎসব

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিম আকাশের সূর্য আরও নিস্তেজ হয়ে আসে। সাগরের ঢেউয়ের শব্দের সঙ্গে মিশে যায় ভক্তদের কণ্ঠে উচ্চারিত ‘জয় মা দুর্গা’ ধ্বনি। একে একে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এবারের শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।

সৈকতজুড়ে তখনও মানুষের ভিড়। কারও চোখে উৎসবের স্মৃতি, কারও মনে বিদায়ের আবেগ, আবার কারও মনে আগামী বছরের দুর্গোৎসবের অপেক্ষা। প্রতিমা সাগরের জলে বিলীন হলেও ভক্তদের বিশ্বাস, দেবীর আশীর্বাদ ও শুভশক্তির বার্তা থেকে যাবে তাঁদের হৃদয়ে।

লাবণী পয়েন্টের এই আয়োজন প্রমাণ করেছে, ধর্মীয় উৎসব মানুষের মধ্যে আনন্দ, আবেগ ও সম্প্রীতির বন্ধন গড়ে তোলার এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হতে পারে। পর্যটক, দর্শনার্থী ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত এদিন সত্যিই পরিণত হয়েছিল জনসমুদ্রে। আর সেই জনসমুদ্রের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা প্রার্থনা করেছেন—অশুভের বিনাশ হোক, শুভশক্তির জয় হোক, পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক এবং মানুষের জীবন ভরে উঠুক সুখ, সমৃদ্ধি ও কল্যাণে।

ক্যাটাগরি