কক্সবাজার জেলা

মানবিক সংকটের আড়ালে আরেক সংকট: রোহিঙ্গা প্রতিক্রিয়া, কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও নারী-নেতৃত্বাধীন সংস্থার প্রান্তিকীকরণ

জলবায়ু পরিবর্তন, জীবিকা ও শিক্ষার সংকট, অসম অর্থায়ন এবং স্থানীয় নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতার মধ্যে কক্সবাজারের মানুষ ও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের টিকে থাকার লড়াই..

একটি সংকটের আড়ালে আরেকটি সংকট
কক্সবাজার বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন অঞ্চল, প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ উপকূলীয় জনপদ এবং দীর্ঘদিনের স্থানীয় সংস্কৃতি ও অর্থনীতির কেন্দ্র। অথচ এই জেলার উখিয়া, টেকনাফ ও পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলো আজ এমন এক বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি, যেখানে রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট, স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ, শিক্ষার মান, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা এবং মানবিক সহায়তার অসম বণ্টন পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।

২০১৭ সালের পর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ব্যাপক আগমনের ফলে কক্সবাজারে মানবিক সহায়তার একটি বিশাল কাঠামো গড়ে উঠেছে। এই সহায়তা লাখ লাখ মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীও নিজেদের ভূমি, শ্রম, প্রাকৃতিক সম্পদ, সামাজিক অবকাঠামো ও জীবিকার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ অনুভব করছে। ২০২৬ সালের জাতিসংঘের সংশোধিত যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনা বা Joint Response Plan (JRP) অনুযায়ী, রোহিঙ্গা শরণার্থী ও ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন মেটাতে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত ৭১০.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন। পরিকল্পনাটিতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কল্যাণ, জীবিকা, কর্মসংস্থান, স্থানীয় নেতৃত্ব এবং জলবায়ু সহনশীলতার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

কিন্তু মৌলিক প্রশ্ন হলো: মানবিক সহায়তার এত বড় কাঠামো থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি সংকট কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে? যারা বছরের পর বছর এই মানবিক কার্যক্রমের বাস্তবতা বহন করছেন, সেই স্থানীয় সংগঠন, নারী-নেতৃত্বাধীন সংস্থা, শিক্ষক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক ও দরিদ্র পরিবারগুলো সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে কতটা অংশীদার হতে পারছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার পরিবর্তে সংকটের কাঠামোগত কারণগুলো চিহ্নিত করতে হবে।

স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা: ক্রমবর্ধমান ব্যয়, সংকুচিত সুযোগ
উখিয়া ও টেকনাফের সহ কক্সবাজার এর পরিবার গুলো দীর্ঘদিন ধরে কৃষিকাজ, মাছ ধরা, দিনমজুরি, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, পর্যটন এবং অনানুষ্ঠানিক শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বাজারের অস্থিরতা, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, জমি ও বাসস্থানের ওপর চাপ এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকি তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।
একটি দরিদ্র পরিবারের আয় যখন খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার ন্যূনতম ব্যয় মেটাতেই শেষ হয়ে যায়, তখন সন্তানের মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন কিংবা ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়ের সুযোগ থাকে না। কোনো পরিবার ঋণ নেয়, কোনো পরিবার সন্তানের পড়াশোনার ব্যয় কমায়, আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে অনিশ্চিত ও কম মজুরির কাজে যুক্ত হয়।
এই বাস্তবতা শুধু ব্যক্তিগত দারিদ্র্যের প্রশ্ন নয়। এটি আঞ্চলিক উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মানবিক সহায়তার কার্যকারিতার প্রশ্ন।

স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনভিত্তিক উন্নয়ন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সুরক্ষা যদি মানবিক কার্যক্রমের সঙ্গে সমন্বিত না হয়, তাহলে দারিদ্র্যের আন্তঃপ্রজন্ম চক্র ভাঙা কঠিন হবে।

কৃষিজমি, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক সম্পদের সংকট
কক্সবাজারের উপকূলীয় পরিবেশ ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি, বন্যা, ভূমিধস, লবণাক্ততা এবং অন্যান্য জলবায়ুজনিত ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এসব ঝুঁকির প্রভাব সব এলাকায় সমান নয়; তবে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর জীবিকা, খাদ্যনিরাপত্তা ও বসবাসের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

অন্যদিকে, জনসংখ্যার চাপ, অবকাঠামো সম্প্রসারণ, বসতি ও অন্যান্য ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বাড়তি চাহিদা কৃষিজমি ও স্থানীয় পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এসব পরিবর্তনের প্রতিটি কারণ ও মাত্রা নির্ধারণে স্থানভিত্তিক ভূমি ব্যবহার, পরিবেশ ও জীবিকা-সংক্রান্ত তথ্য প্রয়োজন।
একজন কৃষক যখন জমি হারান বা জমির উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ায় পর্যাপ্ত আয় করতে পারেন না, তখন তার সংকট কেবল কৃষি উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবারের খাদ্য, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা এবং ঋণ পরিশোধ—সবকিছুই ঝুঁকিতে পড়ে।

তাই কক্সবাজারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় কৃষিজমি সংরক্ষণ, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, স্থানীয় কর্মসংস্থান, মৎস্যসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য পৃথক ও পর্যাপ্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন।

শুধু জরুরি মানবিক সহায়তা দিয়ে এই দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।

শিক্ষার সংকট: বিদ্যালয়ে প্রবেশাধিকারই যথেষ্ট নয়
শিক্ষা একটি অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। কিন্তু বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ থাকলেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন যোগ্য শিক্ষক, নিয়মিত পাঠদান, কার্যকর তদারকি, পর্যাপ্ত শিক্ষাসামগ্রী, নিরাপদ পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা।

কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কিছু এলাকায় মানসম্মত শিক্ষকের সংকট, দক্ষ শিক্ষক ধরে রাখার অসুবিধা, শিক্ষার ব্যয় এবং দরিদ্র পরিবারের অর্থনৈতিক চাপ গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়। তবে এসব সমস্যার প্রকৃত ব্যাপ্তি নির্ধারণের জন্য বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষক-শূন্যপদ, শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনুপাত, উপস্থিতি, শিখনফল ও ঝরে পড়ার হালনাগাদ তথ্য প্রয়োজন।
স্থানীয় দরিদ্র পরিবারগুলো যখন সন্তানের শিক্ষা ও পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়ের মধ্যে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়, তখন দীর্ঘমেয়াদে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে ওঠার পথ সংকুচিত হয়।

মানবিক সহায়তার পরিকল্পনায় তাই জরুরি সেবার পাশাপাশি স্থানীয় বিদ্যালয়ের মানোন্নয়ন, যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ ও ধরে রাখা, কারিগরি শিক্ষা, যুবকদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মমুখী প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

কর্মসংস্থান ও নেতৃত্বে স্থানীয় মানুষের সীমিত অংশগ্রহণ
কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক সংস্থা, জাতীয় এনজিও, ঠিকাদার, পরামর্শক এবং বিভিন্ন মানবিক প্রকল্পের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। কিন্তু এই কার্যক্রমের অর্থনৈতিক সুফল স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে কতটা থাকে, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

স্থানীয় মানুষের অভিযোগ বা উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাপনা পদে পর্যাপ্ত সুযোগ না পাওয়া, স্থানীয় কর্মীদের তুলনামূলক কম বেতন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে সীমিত প্রতিনিধিত্ব এবং প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা।

রাখাইন জনগোষ্ঠী তাদের নিজেদের সাংস্কৃতি হারাচ্ছে, হারাচ্ছে কর্মসংস্হান এবং ভীতিকর পরিবেশে তাদের জীবন যাপন। এছাড়া ও স্থানীয় যুব সমাজ অনেক বেশি আশাহত।

এসব উদ্বেগ যাচাই করতে স্থানীয় ও বহিরাগত কর্মীদের পদভিত্তিক নিয়োগ, বেতন, পদোন্নতি, প্রশিক্ষণ এবং কর্মী ধরে রাখার তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

 

স্থানীয় মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা, ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্পর্ক মানবিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। কিন্তু এই অভিজ্ঞতাকে শুধু মাঠপর্যায়ের কাজের জন্য ব্যবহার করে পরিকল্পনা, বাজেট, ব্যবস্থাপনা ও নীতিনির্ধারণের জায়গায় তাদের অংশগ্রহণ সীমিত রাখলে স্থানীয় নেতৃত্ব বিকশিত হয় না।

 

স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য মানবিক খাতে চাকরি শুধু আয়ের উৎস নয়; এটি দক্ষতা অর্জন, পেশাগত উন্নয়ন এবং নিজ এলাকার ভবিষ্যৎ নির্মাণে অংশগ্রহণের সুযোগও।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জীবন: মানবিক সহায়তার মধ্যেও অনিশ্চয়তা
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংকট তুলে ধরতে গিয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা যাবে না। তারা নিজ দেশ থেকে বাস্তুচ্যুত, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় থাকা একটি জনগোষ্ঠী। তাদের দৈনন্দিন জীবনও খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা ও জীবিকার সীমাবদ্ধতার মধ্যে পরিচালিত হয়।

অত্যন্ত ছোট, প্রায় ১০ ফুট বাই ১০ ফুটের একটি কক্ষে ৮ থেকে ১২ জনের বসবাসের মতো পরিস্থিতি যদি কোনো পরিবারে থাকে, তাহলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, শিশুদের পড়াশোনা, নারীদের নিরাপত্তা, ঘুম, পরিচ্ছন্নতা ও মানসিক সুস্থতার ওপর গুরুতর চাপ পড়ে। তবে এ ধরনের আবাসনের ব্যাপ্তি নির্ধারণের জন্য আশ্রয়স্থলভিত্তিক যাচাই করা তথ্য প্রয়োজন।
অতিরিক্ত ঘনবসতি, সীমিত স্যানিটেশন, অগ্নিকাণ্ড ও দুর্যোগের ঝুঁকি এবং পর্যাপ্ত নিরাপদ স্থানের অভাব মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনকে কঠিন করে তোলে।

অন্যদিকে, নতুন করে বাস্তুচ্যুত মানুষের আগমন এবং দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কারণে মানবিক সেবার ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে। জাতিসংঘের ২০২৬ সালের আপডেটে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের শুরু থেকে আনুমানিক আরও ১,৫০,০০০ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে, যা সীমিত সম্পদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর একটি অংশ ক্যাম্পের বাইরে অবস্থান করছে বা বিভিন্ন এলাকায় চলাচল করছে এমন উদ্বেগ থাকলে তার পরিসর, অবস্থান, চলাচলের কারণ এবং সেবাপ্রাপ্তির অবস্থা নির্ভরযোগ্য তথ্যের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো প্রমাণ ছাড়া পুরো জনগোষ্ঠী সম্পর্কে সাধারণীকরণ করলে সংকটের প্রকৃত কারণ আড়াল হতে পারে এবং স্থানীয় ও শরণার্থী জনগোষ্ঠীর মধ্যে অবিশ্বাস বাড়তে পারে।

রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ন্যায্য উন্নয়ন- দুটি লক্ষ্য পরস্পরবিরোধী নয়। বরং সুষম পরিকল্পনা ও ন্যায়সংগত সম্পদ বণ্টনের মাধ্যমে উভয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নত করা সম্ভব।

JRP ও নারী-নেতৃত্বাধীন স্থানীয় সংস্থার প্রান্তিকীকরণ
এই সংকটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যে স্থানীয় সংস্থাগুলো মাঠপর্যায়ে জনগণের সঙ্গে কাজ করে, মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতি বোঝে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দিতে পারে, তারা কি মানবিক অর্থায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে যথাযথ অংশীদারত্ব পাচ্ছে?

রোহিঙ্গা প্রতিক্রিয়ার ২০২৫–২৬ সালের JRP-তে জাতীয় সংস্থার অংশগ্রহণের উল্লেখ থাকলেও জাতীয় পর্যায়ের কোনো সংস্থার উপস্থিতি এবং কক্সবাজারভিত্তিক স্থানীয় সংস্থার কার্যকর নেতৃত্ব এক বিষয় নয়। কোনো সংস্থা জাতীয়ভাবে নিবন্ধিত হলেই স্থানীয় সংগঠনের বাস্তব প্রতিনিধিত্ব, অর্থায়নের ন্যায্যতা কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমান ক্ষমতা নিশ্চিত হয় না।

২০২৬ সালের ৪ অক্টোবর প্রকাশিত কক্সবাজারভিত্তিক CSO NGO Forum-এর ওয়েবপেজে COAST Foundation ও CCNF-এর একটি স্থানীয়করণবিষয়ক গবেষণার সারাংশ তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে ২০২৬ সালের JRP-তে আবেদনকারী অংশীদার হিসেবে জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর জন্য ৮৭.৯৬%, আন্তর্জাতিক এনজিওর জন্য ৭.৭৮% এবং জাতীয় এনজিওর জন্য ৪.২৬% অর্থায়নের কথা বলা হয়েছে; স্থানীয় এনজিওর অংশ দেখানো হয়েছে ০%। একই সারাংশে ৫১৯ মিলিয়ন টাকা প্রকল্প অর্থায়নের মধ্যে স্থানীয় এনজিওগুলোর প্রাপ্তি ২.৫% বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই পরিসংখ্যানগুলো গবেষণাটির প্রকাশিত সারাংশ থেকে নেওয়া, পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন, অর্থায়নের সংজ্ঞা, নমুনা, হিসাবের পদ্ধতি এবং প্রকল্পভিত্তিক তথ্য যাচাই করে তবেই এগুলোকে চূড়ান্ত জাতীয় বা সামগ্রিক হিসাব হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। তবে এগুলো স্থানীয় সংস্থার অর্থায়ন, নেতৃত্ব ও অংশীদারত্ব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে।

বিশেষত নারী-নেতৃত্বাধীন স্থানীয় সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রে সমস্যা আরও জটিল হতে পারে। নারীদের সংগঠনগুলো অনেক সময় নারী ও কিশোরীদের সুরক্ষা, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যবিধি, জীবিকা, সামাজিক সংহতি এবং কমিউনিটির আস্থাভিত্তিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের অবদান থাকা সত্ত্বেও সরাসরি অর্থায়ন, বড় বাজেট পরিচালনা, কনসোর্টিয়ামে নেতৃত্ব এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের সুযোগ সীমিত থাকলে প্রকৃত স্থানীয়করণ অর্জিত হয় না।

স্থানীয়করণ মানে শুধু স্থানীয় সংস্থাকে প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া নয়; স্থানীয় সংস্থাকে অর্থ, সিদ্ধান্ত, নেতৃত্ব ও জবাবদিহির প্রকৃত ক্ষমতা দেওয়া।

নারী-নেতৃত্বের পরিচয়, স্থানীয় পরিচয় ও অংশীদারত্বের স্বচ্ছতা
নারী-নেতৃত্বাধীন এবং স্থানীয় সংস্থার প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন হলো সংস্থার পরিচয় ও নেতৃত্বের দাবিগুলো কীভাবে যাচাই করা হয়?

যদি কোনো সংস্থা নিজেকে নারী-নেতৃত্বাধীন, স্থানীয় বা কমিউনিটি-ভিত্তিক হিসেবে উপস্থাপন করে, তাহলে তার নেতৃত্বের কাঠামো, পরিচালনা পর্ষদের গঠন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, স্থানীয় উপস্থিতি এবং আর্থিক নিয়ন্ত্রণের বাস্তবতা স্বচ্ছভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

একইভাবে, জাতীয় নিবন্ধন থাকলেই কোনো সংস্থা কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে এমন সিদ্ধান্তও যথার্থ নয়।
বরং দাতা ও সমন্বয়কারী সংস্থাগুলোর উচিত অভিন্ন মানদণ্ড, স্বাধীন যাচাই, স্বার্থের সংঘাত প্রকাশ এবং অংশীদার নির্বাচনের নথি নিশ্চিত করা প্রকৃত লোকাল এবং ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠীর কাছে।

এতে প্রকৃত নারী-নেতৃত্বাধীন ও স্থানীয় সংস্থাগুলো ন্যায্য প্রতিযোগিতার সুযোগ পাবে এবং মানবিক সহায়তার প্রতি আস্থা বাড়বে।

অর্থায়নের প্রবাহ, ঠিকাদারি ও স্থানীয় অর্থনীতির ওপর প্রভাব
মানবিক সহায়তার বাজেট শুধু প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নয়; এটি স্থানীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, দক্ষতা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলে।

যখন কর্মী নিয়োগ, পণ্য ক্রয়, পরিবহন, পরামর্শক সেবা, নির্মাণকাজ এবং অন্যান্য চুক্তির বড় অংশ স্থানীয় বাজারের বাইরে চলে যায়, তখন জেলার ভেতরে অর্থনৈতিক সুফল সীমিত থাকার ঝুঁকি থাকে। অন্যদিকে, স্থানীয় সরবরাহকারী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী ও দক্ষ শ্রমিকরা যদি স্বচ্ছ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কাজের সুযোগ পান, তাহলে প্রকল্পের অর্থ স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারে।

এখানে মূল প্রশ্ন শুধু অর্থ কোথায় খরচ হলো তা নয়; বরং কত অর্থ স্থানীয়ভাবে থাকল, কত স্থানীয় মানুষ কাজ পেলেন, কত ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান সরবরাহকারী হতে পারল এবং প্রকল্প শেষে কী ধরনের স্থায়ী সক্ষমতা তৈরি হলো।

স্থানীয় মানুষের মধ্যে যদি এমন ধারণা তৈরি হয় যে বড় অঙ্কের মানবিক অর্থায়নের সুফল অন্য জেলা বা দেশের প্রতিষ্ঠান ও কর্মীদের কাছে যাচ্ছে, অথচ স্থানীয় জনগোষ্ঠী দারিদ্র্য ও বেকারত্বের মধ্যে রয়ে যাচ্ছে, তাহলে আস্থা ও সামাজিক সংহতি দুর্বল হতে পারে।

একই ভাবে ঢালাও ভাবে ক্যাপাসিটি গ্যাপ বলা
যাচাই ছাড়া এসব অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা গবেষণার নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করবে মানবিক কর্মীদের।
প্রয়োজন হলো প্রকল্পের বাজেট, প্রধান ঠিকাদার, উপঠিকাদার, সরবরাহকারীর অবস্থান, স্থানীয় কর্মসংস্থানের হার, প্রশাসনিক ব্যয় এবং প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুফল কোথায় যাচ্ছে এসব বিষয়ে যথাযথ স্বচ্ছতা।

দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও সামাজিক অপরাধের ঝুঁকি
দারিদ্র্য, বেকারত্ব, ঋণের চাপ, শিক্ষার সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা একটি সমাজের সামাজিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করতে পারে। যখন তরুণদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ কম থাকে, তখন তাদের সামনে ইতিবাচক বিকল্পের পরিসর সংকুচিত হয়ে যায়।

কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছিনতাই, চুরি বা অন্যান্য অপরাধ নিয়ে উদ্বেগ থাকলে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। তবে অপরাধ বৃদ্ধির প্রকৃত মাত্রা ও কারণ নির্ধারণে পুলিশি পরিসংখ্যান, অপরাধের ধরন, স্থানভিত্তিক প্রবণতা, আর্থসামাজিক তথ্য এবং স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করা যেমন অন্যায্য, তেমনি স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা ও জীবিকার সংকটকে উপেক্ষা করাও গ্রহণযোগ্য নয়।
অপরাধ প্রতিরোধে নিরাপদ জনপরিসর, যুবকদের কর্মসংস্থান, মানসম্মত শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, কমিউনিটি-ভিত্তিক উদ্যোগ এবং নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। মানবিক ও উন্নয়ন কার্যক্রমকে স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করে দেখতে হবে।

মানবিক নীতিমালা: প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান
মানবিক কার্যক্রমের মূলনীতি হলো মানবতা, নিরপেক্ষতা, পক্ষপাতহীনতা এবং স্বাধীনতা। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে জবাবদিহি, সুরক্ষা, অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা এবং ক্ষতি না করার নীতি।
কিন্তু বাস্তবে যখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও কোনো স্থানীয় সংস্থা শুধু সীমিত প্রশাসনিক সক্ষমতা, জটিল আবেদনপদ্ধতি, বড় প্রতিষ্ঠানের অংশীদার হওয়ার সুযোগের অভাব কিংবা পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা না পাওয়ার কারণে অর্থায়নের বাইরে থেকে যায়, তখন নীতিগত প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়।

স্থানীয় সংস্থার আর্থিক ব্যবস্থাপনা, সুরক্ষা নীতি, পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন, অভিযোগ গ্রহণব্যবস্থা এবং প্রতিবেদন তৈরির সক্ষমতা শক্তিশালী করা অবশ্যই জরুরি। তবে সক্ষমতা উন্নয়নের নামে স্থানীয় সংস্থাকে অনির্দিষ্টকাল ধরে অধস্তন অবস্থানে রাখা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট হতে হবে অংশীদারত্বের অংশ অর্থায়ন পাওয়ার আগে অতিক্রম করতে হবে এমন একটি স্থায়ী বাধা নয়। সক্ষমতা যাচাইয়ের মানদণ্ডও হতে হবে স্বচ্ছ, অনুপাতসম্মত এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার বাস্তবতা অনুযায়ী ন্যায্য।

আই এনজিও এবং লোকাল এনজিও কে একই মানদণ্ডে মাপাও একটি বড় ভুল।
তার বর্হিবিশ্বে সুষম বণ্টনের সুযোগ আছে আন্তর্জাতিক মানের স্টাফ আছে যাদের অনেক বেশি বেতনে রাখার সুযোগ ও সক্ষমতা তাদের তৈরি।

কিন্তু আমার দেশের স্বল্প সম্পদ!
বিশেষত নারী-নেতৃত্বাধীন সংস্থাগুলোর জন্য নমনীয় অর্থায়ন, দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা, সরাসরি চুক্তি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে অর্থায়নের সেই বিষয় টি ও জরুরি কারণ তাদের চিন্তা গুলো গ্রুপিংয়ের নাকি পরিবার কেন্দ্রীক বা সাম্প্রদায়িক নাকি অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার আর দেওয়ার।

কারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সেটা জরুরি তারা কি নিরপেক্ষ?

কক্সবাজারের জন্য কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন?
রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। জীবনরক্ষাকারী মানবিক সহায়তার পাশাপাশি স্থানীয় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকা, জলবায়ু সহনশীলতা, কৃষি, কর্মসংস্থান ও সামাজিক অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

JRP এবং সংশ্লিষ্ট অর্থায়ন কাঠামোয় স্থানীয় নারী-নেতৃত্বাধীন ও স্থানীয়ভাবে পরিচালিত সংস্থার অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।

সরকারি প্রতিষ্ঠান কে JRP গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রাখা

শুধু জাতীয় এনজিওর সংখ্যা দিয়ে স্থানীয়করণের অগ্রগতি পরিমাপ না করে স্থানীয় সংস্থার সরাসরি অর্থায়ন, প্রকল্প নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা মূল্যায়ন করতে হবে।
অন্য জেলা আর কক্সবাজারের স্হানীয় এনজিও মধ্যে একটি বড় পার্থক্য আছে সেটা কে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি।
প্রকৃত স্থানীয় ও নারী-নেতৃত্বাধীন পরিচয় যাচাইয়ের জন্য স্বচ্ছ মানদণ্ড এবং স্বাধীন পর্যালোচনা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত, অংশীদার নির্বাচন, বাজেট বরাদ্দ এবং প্রকল্পের বাস্তবায়ন সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করতে হবে।

স্থানীয় অর্থনীতিতে মানবিক অর্থায়নের অবদান পরিমাপ করতে হবে। স্থানীয় কর্মী নিয়োগ, ন্যায্য মজুরি, স্থানীয় পণ্য ও সেবা ক্রয়, ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ এবং জেলার ভেতরে অর্থনৈতিক সুফল ধরে রাখার সূচক নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, কৃষিজমি, পরিবেশ, জীবিকা, যুব কর্মসংস্থান এবং অপরাধ-সংক্রান্ত উদ্বেগের ওপর স্বাধীন গবেষণা ও নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। অভিযোগ, ধারণা ও যাচাইকৃত তথ্যকে আলাদা করে দেখলে নীতিনির্ধারণ আরও কার্যকর হবে।

অর্থায়ন কাঠামো এতটাই জটিল করা হয়েছে লোকাল লিডারশীপ কে ছোট করে দেখানো এবং উগ্র ভাবে উপস্থাপন করে তাদের সুনাম নষ্ট সহ লোকাল নেতৃত্বের বাগ স্বাধীনতা খর্ব করা হচ্ছে। নারী-নেতৃত্বাধীন সংস্থাগুলোকে শুধু নারী ও কিশোরীদের কাছে পৌঁছানোর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার না করে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

তাদের রিপোটিং এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যে দিয়ে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর এবং অস্তিত্ব জানান দেওয়ার সুযোগ থাকা জরুরি।

তাদের পরিকল্পনা, বাজেট, নেতৃত্ব, পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহির ক্ষেত্রেও সমান মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে আস্থা, পারস্পরিক সম্মান এবং সামাজিক সংহতি জোরদার করতে হবে। কোনো জনগোষ্ঠীকে অন্য জনগোষ্ঠীর সংকটের জন্য দায়ী না করে ন্যায়সংগত নীতি, কার্যকর সেবা এবং স্বচ্ছ সম্পদ বণ্টনের মাধ্যমে উভয়ের দুর্দশা কমাতে হবে।

স্থানীয় মানুষকে বাদ দিয়ে স্থানীয়করণ সম্ভব নয়
কক্সবাজারের সংকটকে শুধু রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে এই অঞ্চলের সামগ্রিক বাস্তবতা বোঝা সম্ভব নয়। আবার স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কষ্টকে তুলে ধরতে গিয়ে শরণার্থীদের মানবিক অধিকার উপেক্ষা করলেও কোনো টেকসই সমাধান আসবে না।

স্থানীয় পরিবারগুলো যখন শিক্ষা, কর্মসংস্থান, কৃষি, পরিবেশ ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বিগ্ন, তখন রোহিঙ্গা পরিবারগুলোও নিরাপদ আশ্রয়, খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তার জন্য সংগ্রাম করছে। এই দুই বাস্তবতা একই মানবিক সংকটের পরস্পর-সম্পর্কিত দিক।

একইভাবে, স্থানীয় নারী-নেতৃত্বাধীন সংস্থাগুলো যদি মাঠপর্যায়ে মানুষের আস্থা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে কাজ করেও অর্থায়ন, নেতৃত্ব এবং নীতিনির্ধারণে যথাযথ জায়গা না পায়, তাহলে স্থানীয়করণের প্রতিশ্রুতি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

মানবিক সহায়তার সাফল্য শুধু কত অর্থ সংগ্রহ হলো, কতটি প্রকল্প পরিচালিত হলো কিংবা কতজনকে সেবা দেওয়া হলো এসব দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। দেখতে হবে, স্থানীয় মানুষের জীবন কতটা উন্নত হলো, নারী-নেতৃত্বাধীন সংস্থার ক্ষমতা কতটা বৃদ্ধি পেল, অর্থায়নের সুফল কতটা ন্যায্যভাবে বণ্টিত হলো এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ কতটা মর্যাদা ও নিরাপত্তা পেলেন।

কক্সবাজারের মানুষ দয়া নয়, ন্যায্য অধিকার, মর্যাদাপূর্ণ সুযোগ এবং উন্নয়নের অংশীদারত্ব চান। রোহিঙ্গা শরণার্থীরাও চান নিরাপত্তা, মানবিক মর্যাদা এবং একটি টেকসই ভবিষ্যৎ।

প্রকৃত স্থানীয়করণ তখনই সফল হবে, যখন স্থানীয় মানুষ শুধু মানবিক সংকটের বোঝা বহন করবেন না বরং সংকটের সমাধান নির্ধারণ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের নেতৃত্বও দেবেন।
এখন সময় কক্সবাজারকে শুধু মানবিক সহায়তার একটি ভৌগোলিক কেন্দ্র হিসেবে না দেখে, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও রোহিঙ্গা শরণার্থী—উভয়ের অধিকার, মর্যাদা, জীবিকা এবং ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার একটি যৌথ দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।

লেখক : শিউলী শর্মা, নির্বাহী পরিচালক, জাগো নারী উন্নয়ন সংস্থা।

ক্যাটাগরি