কক্সবাজারে ৮ মাসে ৯৭ খুন, ২০ ঘটনায় হত্যার কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা
কক্সবাজারে চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ৯৭টি হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৯৯টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে হত্যা মামলা কমেছে দুটি। তবে একই সময়ে মাদক ও চোরাচালানসহ কয়েকটি অপরাধের মামলা বেড়েছে।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) কক্সবাজার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সাম্প্রতিক অপরাধের রহস্য উদ্ঘাটন নিয়ে আয়োজিত অবহিতকরণ সভায় এসব তথ্য তুলে ধরেন পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান।
পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত জেলায় মোট ৩ হাজার ৩৯৯টি মামলা হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে মামলা হয়েছিল ৩ হাজার ১১৭টি। অর্থাৎ এক বছরে মামলা বেড়েছে ২৮২টি।
চলতি বছরের প্রথম আট মাসে খুনের পাশাপাশি ডাকাতির মামলা হয়েছে ১৪টি, দস্যুতার ২৩টি, চুরির ১৬০টি এবং দণ্ডবিধির আওতায় অপহরণের মামলা ৪৭টি। এ সময়ে মাদকদ্রব্য-সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ১ হাজার ৪৯টি এবং চোরাচালানের মামলা ১০২টি। গত বছরের একই সময়ে এসব মামলা ছিল যথাক্রমে ১৬, ২৫, ১৫৭, ৫৫, ১ হাজার ৫ এবং ৪৯টি।
পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে খুন, ডাকাতি ও দস্যুতার মামলা দুটি করে এবং অপহরণের মামলা আটটি কমেছে। বিপরীতে চুরির মামলা তিনটি, মাদকসংক্রান্ত মামলা ৪৪টি এবং চোরাচালানের মামলা ৫৩টি বেড়েছে।
২০ হত্যার কারণ এখনো অজানা
পুলিশ সুপার জানান, চলতি বছরের ৯৭টি হত্যা মামলার মধ্যে ২৩টির পেছনে পূর্বশত্রুতা, ১৭টির পেছনে পারিবারিক কলহ এবং ১২টির পেছনে জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে চারটি করে এবং পরকীয়ার জেরে তিনটি হত্যার মামলা হয়েছে।
এ ছাড়া অপহরণের পর হত্যা চারটি, চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে একটি, ছিনতাইকারীর আঘাতে একটি, চুরির ঘটনায় আঘাতের কারণে একটি, ধর্ষণে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে একটি, মানব পাচারকে কেন্দ্র করে একটি এবং ধর্ষণের পর হত্যার একটি মামলা রয়েছে। নবজাতক হত্যা, বন্দুকযুদ্ধ, ইউডি থেকে খুন এবং কোর্ট পিটিশনের মাধ্যমে হত্যার মামলা রয়েছে একটি করে।
পুলিশের তথ্যমতে, ২০টি হত্যার কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে চলতি বছরে কোনো হত্যা মামলা হয়নি।
পুলিশ সুপার বলেন, অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের পেছনে পূর্বশত্রুতা, পারিবারিক কলহ ও জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে। কোনো ঘটনাকেই ছোট করে না দেখে সবগুলো গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
মাদক ও অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের পরিসংখ্যান
জেলা পুলিশের তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে মাদকদ্রব্য-সংক্রান্ত ৩৭৮টি মামলায় ৫২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময় ৩৭ লাখ ৩ হাজার ২৪১ পিস ইয়াবা, ৩ হাজার ৬৭ লিটার দেশি মদ, ৬২ কেজি ৩৫০ গ্রাম গাঁজা, ৫৪ বোতল বিয়ার এবং ১ কেজি ২৫০ গ্রাম ক্রিস্টাল মেথ উদ্ধার করা হয়েছে।
২০২৫ সালের একই সময়ে মাদকসংক্রান্ত ১১৫টি মামলায় ১৫১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তখন ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৩০৬ পিস ইয়াবা, ২ হাজার ৩০৬ লিটার দেশি মদ, ১৫ কেজি ১২০ গ্রাম গাঁজা ও ৮ গ্রাম ক্রিস্টাল মেথ উদ্ধার করা হয়।
চলতি বছরের প্রথম আট মাসে অস্ত্র আইনে ৬২টি মামলায় ৮০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ সময় ৮৩টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ১ হাজার ২২৫ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে অস্ত্র আইনে মামলা হয়েছিল ৪২টি এবং গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ৫২ জনকে; উদ্ধার হয়েছিল ৪৫টি আগ্নেয়াস্ত্র।
এ ছাড়া পুলিশের বিশেষ অভিযানে গত কয়েক দিনে ছিনতাইকারী, মাদকসেবী ও চোরসহ ৩১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৬৩ জন ছিনতাইকারী, ১০৪ জন মাদকসেবী এবং ৪৮ জন চোর বলে জানিয়েছে পুলিশ।
৩০ মামলার আসামি ‘বাদইল্যা ডাকাত’ গ্রেপ্তার
সভায় পুলিশ সুপার শাহজাহান আলম ওরফে ‘বাদইল্যা ডাকাত’কে গ্রেপ্তারের তথ্যও জানান। তাঁর ভাষ্য, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে সংঘটিত ডাকাতির ঘটনায় শাহজাহানের বিরুদ্ধে ৩০টি মামলা রয়েছে। তাঁর বাড়ি কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার সাহারবিল এলাকায়।
পুলিশের দাবি, জেলার কয়েকটি বড় ডাকাতির ঘটনায় শাহজাহানকে অন্যতম মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ডাকাতির সময় চক্রটি একটি নোহা গাড়ি ব্যবহার করত এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে বিভিন্ন সময়ে গাড়িটির রং পরিবর্তন করা হতো। সাধারণত রাত ১টা থেকে ভোর ৪টার মধ্যে ডাকাতি করে ১০ থেকে ১২ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থল ত্যাগ করত চক্রটি বলে জানায় পুলিশ।
অভিযানে শাহজাহানকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি একটি নোহা গাড়ি ও দুটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ সুপার আরও দাবি করেন, চক্রের কোনো সদস্য গ্রেপ্তার হলে আইনি সহায়তার জন্য ডাকাতির অর্থের একটি অংশ আলাদা করে রাখা হতো। ডাকাতদের আইনি সহায়তা দেন এমন কয়েকজন আইনজীবীর নামও পুলিশ পেয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছেন কক্সবাজার আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবদুল মান্নান। তিনি বলেন, আইনজীবীদের কাজই হলো আসামির পক্ষে আইনি সহায়তা দেওয়া ও জামিন চাওয়া। জামিন দেওয়া বা না দেওয়া আদালতের এখতিয়ার।
পুলিশ সুপার বলেন, মামলা বাড়লেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে—এমনটি বলা যায় না। অপরাধ দমনে পুলিশের তৎপরতা ও মামলা গ্রহণের কারণেও মামলার সংখ্যা বাড়তে পারে।