সেন্টমার্টিনগামী সব জাহাজই ত্রুটিযুক্ত: নিরাপত্তায় বড় ঘাটতি
কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন নৌরুটে চলাচলকারী কোনো পর্যটকবাহী জাহাজই শতভাগ নিরাপদ নয়। চলতি পর্যটন মৌসুমে অগ্নিকাণ্ডসহ নানা ধরনের ঝুঁকি নিয়েই এসব জাহাজ যাত্রী বহন করছে। অনুমোদন পাওয়া প্রতিটি জাহাজেই রয়েছে কোনো না কোনো নিরাপত্তা ত্রুটি বা শর্ত লঙ্ঘন, আবার কোনো কোনো জাহাজে একাধিক গুরুতর ঘাটতিও শনাক্ত হয়েছে।
সম্প্রতি সেন্টমার্টিনগামী একটি পর্যটকবাহী জাহাজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর প্রশাসনের নজরে আসে বিষয়টি। এরপর চলতি মৌসুমে চলাচলের অনুমতি পাওয়া সাতটি জাহাজের মধ্যে এমভি এলসিটি কাজল ও এমভি দি আটলান্টিক ক্রুজের অনুমোদন বাতিল করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতেই গত ৩০ ডিসেম্বর ভোররাতে কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর নুনিয়ারছড়া এলাকায় বিআইডব্লিউটিএ জেটি ঘাটে কোস্টগার্ডের নেতৃত্বে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে জাহাজগুলোর একাধিক নিরাপত্তা ত্রুটি ও বিধি লঙ্ঘনের বিষয় শনাক্ত হয় এবং সে বিষয়ে কোস্টগার্ড নৌপরিবহন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে লিখিত প্রতিবেদন পাঠায়।
কোস্টগার্ডের প্রতিবেদনে যেসব জাহাজে নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো হলো এমভি বার আউলিয়া, এমভি কর্ণফুলি, এমভি কেয়ারি সিন্দাবাদ, এমভি বে-ক্রুজার, এমভি কেয়ারি ক্রুজ অ্যান্ড ডাইন এবং এমভি দি আটলান্টিক ক্রুজ। এসব জাহাজে ন্যূনতম সেইফ ম্যানিং ডকুমেন্ট নেই এবং বিধি অনুযায়ী দুইজন মাস্টার ও দুইজন ড্রাইভার থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে রয়েছে একজন করে। অনেক জাহাজে ফায়ার ও সেফটি প্ল্যান অনুযায়ী লাইফ সেভিং অ্যাপ্লায়েন্স ও ফায়ার ফাইটিং অ্যাপারেটাস নেই এবং পর্যাপ্ত কার্যকর লাইফ জ্যাকেটও পাওয়া যায়নি। সার্ভে সার্টিফিকেটে উল্লেখিত মাস্টারের নামের সঙ্গে জাহাজে কর্মরত মাস্টারের নামের মিল নেই বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া বেশিরভাগ জাহাজেই মেইন ইঞ্জিনের ওভারহলিং সংক্রান্ত কোনো ডকুমেন্ট পাওয়া যায়নি। অনেক ক্ষেত্রে ফায়ার পাম্প কার্যকর অবস্থায় ছিল না এবং পর্যাপ্ত হোজ পাইপও অনুপস্থিত ছিল। ইঞ্জিনরুমে স্থায়ী কার্বন ডাই-অক্সাইড সিস্টেম নেই, ফায়ার কন্ট্রোল প্যানেল, ফায়ার অ্যালার্ম ও ফায়ার ডিটেকশন সিস্টেম কার্যকর পাওয়া যায়নি। এমনকি জাহাজ পরিচালনাকারী মাস্টার ও ড্রাইভারদের কাছেও বেসিক ফায়ার ফাইটিং ট্রেনিং সার্টিফিকেট নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সেন্টমার্টিন রুটে চলাচলকারী পর্যটকবাহী জাহাজগুলোর নিরাপত্তা ঝুঁকি উল্লেখ করে ব্যবস্থা নিতে গত রোববার ৪ জানুয়ারি নৌপরিবহন অধিদপ্তরের চিফ ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড শিপ সার্ভেয়ার অধিশাখার মহাপরিচালক কমোডর মো. শফিউল বারী স্বাক্ষরিত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে সব ত্রুটি ও বিচ্যুতি সংশোধনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঘাটতিগুলো সংশোধন না হলে জাহাজগুলোর চলাচলের অনুমতি বাতিল করা হবে বলেও এতে উল্লেখ রয়েছে।
এ বিষয়ে প্রস্তাবিত কক্সবাজার নদী বন্দরের কর্মকর্তা মো. আব্দুল ওয়াকিল বলেন, কোস্টগার্ডের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের জারি করা প্রজ্ঞাপন এখনও দাপ্তরিকভাবে হাতে পাননি, তবে বিষয়টি অনানুষ্ঠানিকভাবে অবগত আছেন। তিনি জানান, যৌথ অভিযানে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষও জাহাজগুলোতে নিরাপত্তার ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ করেছে। প্রজ্ঞাপন হাতে পাওয়ার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন হাজারো মানুষ সেন্টমার্টিন যাতায়াতে এই নৌরুটের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু নিরাপত্তার মৌলিক শর্ত পূরণ না করেই জাহাজ চলাচল অব্যাহত থাকায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রশ্ন উঠছে, ত্রুটি জানা সত্ত্বেও কেন যাত্রী পরিবহন অব্যাহত রাখা হচ্ছে এবং যাত্রীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই অবহেলা কতদিন চলবে।