শুক্রবার, ১১ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৭শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সারা দেশ

সুদের টাকা নিয়ে বিরোধ, মাটির নিচ থেকে মিলল ব্যবসায়ীর লাশ

রাজধানীর লালবাগে একটি পাঁচতলা ভবনের নিচতলার পাশের বারান্দায় মাটি খুঁড়ে শেখ ওয়াসিম রনী (৪৭) নামে এক ব্যবসায়ীর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তিন লাখ টাকা সুদ নেওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে তাকে হত্যা করে এবং পরবর্তীতে মাটির নিচে চাপা দেওয়া হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।

এ ঘটনায় মো. মাসুম চৌধুরী নামে একজনকে আটক করেছে পুলিশ। ঘটনাস্থলে পুলিশের পাশাপাশি সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ও ডিবি পুলিশের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

গতকাল ১০ই সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর ৯ নম্বর বিসি দাস স্ট্রিটের একটি ভবনে অভিযান শুরু করে পুলিশ। দীর্ঘ সময় অভিযান চালানোর পর শুক্রবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ভবনের নিচতলার পাশের মাটি খুঁড়ে ওয়াসিম রনীর লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে লাশটি ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

নিহতের স্বজননেরা জানান, ওয়াসিম রনী ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

আটক মো. মাসুম চৌধুরীর দুলাভাই বলেন, তার শ্যালক মাসুম ইমিটেশন জুয়েলারির ব্যবসা করতেন। যে ভবনের পাশ থেকে ওয়াসিমের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, সেই ভবনের নিচতলায় মাসুমের একটি পাইকারি কারখানা ছিল।

মাসুমের দুলাভাইয়ের দাবি, প্রায় আট মাস আগে ওয়াসিম রনীর কাছ থেকে মাসুম তিন লাখ টাকা ধার নিয়েছিলেন। ওই টাকার বিপরীতে প্রতি মাসে ৩৫ হাজার টাকা করে সুদ দেওয়ার কথা ছিল। পরে তিন লাখ টাকা ফেরত দেওয়া নিয়ে ওয়াসিমের সঙ্গে মাসুমের বিরোধ তৈরি হয়।

তিনি আরও জানান, গত ৮ সেপ্টেম্বর দুপুরের দিকে পাওনা টাকা চাইতে ওয়াসিম রনী মাসুমের ব্যবসায়িক কক্ষে যান। সেখানে টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে ধস্তাধস্তির সময় মাসুম ওয়াসিমের মাথায় ঘুষি মারেন বলে দাবি করেন তিনি। পরে ওয়াসিম অচেতন হয়ে পড়ে যান বলেও জানান তিনি।

পরে পুলিশের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, ওয়াসিম অচেতন হয়ে যাওয়ার পর তাকে ভবনের পাশের মাটির নিচে চাপা দেওয়া হয়। শুক্রবার ভোরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে সেখান থেকেই তার লাশ উদ্ধার করে।

নিহতের স্ত্রীর ভাই মুরাদ হোসেন জানান, গত ৮ সেপ্টেম্বর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ওয়াসিমের যোগাযোগ হয়। ওই দিন তিন লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে একটি চেক দেওয়ার কথা ছিল বলে তারা জানতে পারেন। তার বড় বোনের স্বামীর সঙ্গে ওয়াসিমের ভালো সম্পর্ক ছিল এবং তাদের ব্যবসায়িক লেনদেনের বিষয়টিও তিনি জানতেন।

মুরাদ হোসেন বলেন, ৮ সেপ্টেম্বর দুপুরের পর থেকেই ওয়াসিমের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একই সঙ্গে ওয়াসিমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করেন তারা। একপর্যায়ে অভিযুক্ত মাসুমের বাড়িতে গিয়ে তার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন পরিবারের সদস্যরা। মাসুমের স্ত্রী ওয়াসিমের বিষয়ে কোনো তথ্য জানেন না বলে জানান। তিনি শুধু বলেন, ওয়াসিম বাসায় এসেছিলেন, পরে চলে গেছেন।

কোনো সন্ধান না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা লালবাগ থানায় গিয়ে ওয়াসিম নিখোঁজের বিষয়ে অভিযোগ করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে বিভিন্নভাবে তার সন্ধান চালায়।

মুরাদ হোসেন জানান, একপর্যায়ে পুলিশ জানতে পারে, ওয়াসিমকে হত্যা করে একটি ভবনের নিচতলার পাশের মাটির নিচে চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। পরে সেখানে অভিযান চালিয়ে মাটি খুঁড়ে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।

মুরাদ হোসেনের অভিযোগ, ওয়াসিমের লাশ লুকিয়ে রাখতে আট বস্তা মাটি এনে বাসার পাশে তাকে চাপা দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, তার বোনের স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি।

নিহতের স্বজনদের আরও অভিযোগ, ওয়াসিমকে হত্যার পর তার হাত-পা বেঁধে মাটির নিচে চাপা দেওয়া হয়েছিল। তবে শরীরে আঘাতের ধরন, মৃত্যুর কারণ এবং কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছেএসব বিষয় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও তদন্ত শেষে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

লালবাগ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) তালেবুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, গত ৮ সেপ্টেম্বর রনী নিখোঁজ হওয়ার পর তার স্বজনরা থানায় অভিযোগ করেন। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। তিনি বলেন, তদন্তের একপর্যায়ে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযুক্তের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নিচতলার পাশের মাটির নিচ থেকে নিখোঁজ ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়।

ডিসি তালেবুর রহমান আরও জানান, এ ঘটনায় মো. মাসুম চৌধুরীকে আটক করা হয়েছে। উদ্ধার করা লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কি না, হত্যার প্রকৃত কারণ ও বিস্তারিত বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

 

ক্যাটাগরি