কক্সবাজার সৈকতে দাঁড়িয়ে বছরের শেষ সূর্যকে বিদায় জানালেন লাখো পর্যটক
পশ্চিম আকাশে হেলে পড়া লাল সূর্য ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছিল সাগরের বুকে। বিস্তীর্ণ বালুচরে বসানো কিটকটে বসে কেউ নিঃশব্দে সেই দৃশ্য উপভোগ করছেন, আবার কেউ সূর্যকে পেছনে রেখে ক্যামেরায় বন্দি করছেন বছরের শেষ মুহূর্ত। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত যেন পরিণত হয়েছিল নীরব আবেগ আর বিদায়ের মিলনমেলায়।
বুধবার বিকেলে সৈকতের সুগন্ধা, লাবণী, কলাতলী ও সি-গাল পয়েন্টজুড়ে উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। বিকেল চারটার দিকে শুধু সুগন্ধা পয়েন্টেই প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে অবস্থান নেন অর্ধলক্ষাধিক পর্যটক। ভাটার টানে পানি সরে গিয়ে তৈরি হওয়া বিশাল বালুচর ছিল মানুষের পদচারণায় মুখর। বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে সূর্য ডুবে যেতেই অনেককে হাত নেড়ে বিদায় জানাতে দেখা যায়-উচ্চারণে ভেসে আসে, “বিদায় ২০২৫।”
তবে আনন্দের উচ্ছ্বাস ছিল সংযত। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ঘোষিত রাষ্ট্রীয় শোকের কারণে কক্সবাজারের সব তারকা হোটেল বাতিল করেছে থার্টি ফার্স্ট নাইটের আয়োজন। সৈকতের কোথাও হয়নি উন্মুক্ত কনসার্ট, আতশবাজি কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অলক বিশ্বাস জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আতশবাজি, পটকা, ফানুস ওড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৬টা থেকে ১ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত জেলার সব বার ও মদের দোকান বন্ধ রাখা হয়েছে। নিষিদ্ধ করা হয়েছে উচ্চ শব্দে হর্ন বাজানো, বেপরোয়া গাড়ি ও মোটরসাইকেল চালানো, জয় রাইড এবং যেকোনো ধরনের উস্কানিমূলক কার্যক্রম। নারী পর্যটকদের নিরাপত্তায় ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথাও জানান তিনি।
নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা আফরোজা খানম বলেন, “কক্সবাজারে বছরের শেষ সূর্যাস্ত দেখাটা আলাদা অনুভূতির। লাল আভায় সাগরটা অন্যরকম লাগে-এই দৃশ্য মনটা ভরে দেয়।”
অন্যদিকে, পুরান ঢাকার অনিন্দ কিছুটা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “থার্টি ফার্স্ট নাইটে কোনো আয়োজন থাকবে ভেবেই পরিবার নিয়ে এসেছিলাম। পরে জেনেছি, এবার সব বন্ধ।”
হোটেল মালিকদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ সাত দিনে (২৫–৩১ ডিসেম্বর) কক্সবাজারে ভ্রমণ করেছেন অন্তত সাড়ে আট লাখ পর্যটক। শহরের পাঁচ শতাধিক হোটেল-মোটেলের প্রায় ৯০ শতাংশ কক্ষ পূর্ণ। দৈনিক ধারণক্ষমতা প্রায় এক লাখ ৬৭ হাজার হলেও পর্যটকের আগমন থেমে নেই।
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল-গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, “বর্ষবিদায়ের কোনো অনুষ্ঠান না থাকলেও মানুষ সূর্যাস্ত দেখতে এসেছেন। তবে কুয়াশার কারণে এবার সূর্য পুরোটা স্পষ্ট ছিল না।”
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহিদুল আলম জানান, সৈকতে উন্মুক্ত কোনো অনুষ্ঠানের অনুমতি দেওয়া হয়নি। পর্যটকদের নিরাপত্তা ও হয়রানি রোধে জেলা প্রশাসনের একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে কাজ করছে।
শোকের আবহ, কঠোর বিধিনিষেধ আর নীরবতার মাঝেও কক্সবাজার সৈকত সাক্ষী হলো বছরের শেষ সূর্যের শান্ত বিদায়ের—যেখানে উচ্ছ্বাসের বদলে ছিল সংযম, আর উৎসবের বদলে স্মৃতির আবেশ।