কক্সবাজারের ৪ আসনে ভোটের প্রস্তুতি সম্পন্ন: ৫৯৮ কেন্দ্র, ১২ হাজারের বেশি পোলিং কর্মকর্তা, নিরাপত্তায় কড়া নজরদারি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কক্সবাজারজুড়ে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সরকার। সীমান্তবর্তী অবস্থান, উপকূলীয় ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন জনপদ থাকার কারণে জেলাটি বরাবরই নির্বাচনী নিরাপত্তায় স্পর্শকাতর হিসেবে বিবেচিত। এ বাস্তবতায় সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথবাহিনী ব্যাপক প্রস্তুতি, কঠোর নজরদারি ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় মাঠে রয়েছে।
ভোটগ্রহণের আগে, ভোটের দিন এবং ভোট-পরবর্তী সময়সহ পুরো নির্বাচনকালীন মেয়াদে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর বাইরে যাতায়াত কার্যত বন্ধ রাখা হয়েছে। ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকা, সীমান্ত, উপকূল ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বাড়ানো হয়েছে টহল, তল্লাশি ও গোয়েন্দা নজরদারি।
রোহিঙ্গাদের ব্যবহার রোধে কঠোর অবস্থান
কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র মিলনায়তনে রামু ১০ পদাতিক ডিভিশনের উদ্যোগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লেফটেন্যান্ট কর্নেল তানভীর আহমেদ বলেন, জাতীয় নির্বাচন ঘিরে কোনো অশুভ শক্তি যাতে রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে নাশকতা বা সহিংসতা সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। ক্যাম্পের ভেতর ও বাইরে গতিবিধি কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
তিনি জানান, কাঁটাতারের বেড়া মেরামত, গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট স্থাপন, নিয়মিত টহল ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ক্যাম্পসংলগ্ন জনপদে সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য বাহিনীর উপস্থিতিও বাড়ানো হয়েছে।
দুর্গম কেন্দ্রে সেনাবাহিনীর স্ট্রাইকিং ফোর্স
জেলার চারটি সংসদীয় আসনের দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে সেনাবাহিনীর স্ট্রাইকিং ফোর্স প্রস্তুত থাকবে বলে জানান লে. কর্নেল তানভীর। কোনো অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা বা সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিলে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির সঙ্গে সমন্বয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেটিই প্রধান লক্ষ্য বলে জানান তিনি।
যৌথ অভিযানে অস্ত্র-মাদক উদ্ধার, আটক ১১৪৯ রোহিঙ্গা
লেফটেন্যান্ট কর্নেল সুতফা জামান জানান, ৩ থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৪৬টি যৌথ অভিযানে ছয়টি আগ্নেয়াস্ত্র, বিপুল দেশীয় অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। ক্যাম্পের বাইরে অবৈধভাবে অবস্থানকারী ১ হাজার ১৪৯ জন রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে। এর আগে ১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৬১টি অভিযানে ৮০ জনকে গ্রেপ্তার এবং ১৯টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, ১০০ রাউন্ড গুলি, ৯৩টি দেশীয় অস্ত্র, একটি ড্রোন, একটি ওয়াকিটকি, ১৩ লাখ টাকার জাল নোট ও বিপুল মাদক উদ্ধার করা হয়।
৫৯৮ কেন্দ্রের মধ্যে ৩২৯টি গুরুত্বপূর্ণ
কক্সবাজারের চারটি আসনে মোট ভোটকেন্দ্র ৫৯৮টি। এর মধ্যে ৩২৯টি কেন্দ্রকে গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কক্সবাজার-১ আসনে ১৮০টির মধ্যে ৯৩টি, কক্সবাজার-২ আসনে ১২৪টির মধ্যে ৫৯টি, কক্সবাজার-৩ আসনে ১৮২টির মধ্যে ১০৯টি এবং কক্সবাজার-৪ আসনে ১১৭টির মধ্যে ৬৮টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অতীত সহিংসতা, সীমান্ত ও ক্যাম্পসংলগ্ন অবস্থানের কারণে এসব কেন্দ্র চিহ্নিত করা হয়েছে।
জেলা সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টার গঠন
নির্বাচনকালীন সমন্বয়ের জন্য গঠন করা হয়েছে ‘জেলা সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টার’। ৯ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এটি রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এখানে সেনাবাহিনী, বিজিবি, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, র্যাব, পুলিশ, ডিজিএফআই, এনএসআই ও আনসার-ভিডিপির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, দ্রুত সিদ্ধান্ত ও কার্যকর সমন্বয়ই শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের চাবিকাঠি।
উপকূল ও দ্বীপাঞ্চলে নৌবাহিনী-কোস্টগার্ড
উপকূলীয় এলাকা ও সেন্টমার্টিনে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের জাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে। ইন এইড টু সিভিল পাওয়ারের আওতায় নৌবাহিনী দেশের ১৭টি আসনে দায়িত্ব পালন করছে। নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান কক্সবাজার পরিদর্শন করেছেন।
সেনাপ্রধানের পরিদর্শন
গত ২৯ জানুয়ারি সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান কক্সবাজার সফর করেন। তিনি নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা, সমন্বয় ও দায়িত্ব পালনে পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সাড়ে ১৩ হাজার সদস্য মোতায়েন
জেলায় নির্বাচনী নিরাপত্তায় মোট ১৩ হাজার ৪৯৯ জন সদস্য মোতায়েন রয়েছেন। এর মধ্যে ২,১৬৬ জন সেনা, ৮৮০ জন বিজিবি, ৩৯৯ জন নৌবাহিনী, ৫০ জন বিমান বাহিনী, ১৪৫ জন কোস্টগার্ড, ৮০ জন র্যাব, ১৯০ জন আনসার ব্যাটেলিয়ন ও ১,৮১৫ জন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। এছাড়া আনসার ও ভিডিপির ৭,৭৭৪ জন সদস্য ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করবেন। ৩৪ জন নির্বাহী ও ৯ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে থাকবেন।
১৮ লাখের বেশি ভোটার
চারটি আসনে মোট ভোটার ১৮ লাখ ৪৯ হাজার ৩৫৭ জন। ৫৯৮টি কেন্দ্রে ৩,৬৮৯টি কক্ষে ভোটগ্রহণে দায়িত্ব পালন করবেন ১২ হাজার ২৫১ জন কর্মকর্তা। প্রিসাইডিং ও সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ৪,৫০৩ জন এবং পোলিং অফিসার ৭,৭৪৮ জন।
সীমান্ত, উপকূল, রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। প্রশাসনের প্রত্যাশা, ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণে শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন হবে।