সদর হাসপাতালে একদিনে তিন লাশ: কী ঘটছে কক্সবাজারে?
কক্সবাজারে একই দিনে তিনটি পৃথক ঘটনায় তিনজনের মরদেহ কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে পৌঁছানোয় জনমনে উদ্বেগ ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। শনিবার (৭ মার্চ) দিনের বিভিন্ন সময়ে হত্যা, আত্মহত্যা ও রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় তিনজনের মরদেহ হাসপাতালের মর্গে আনা হয়। এসব ঘটনার পেছনে সামাজিক অস্থিরতা, চাঁদাবাজি, পারিবারিক কলহ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা এসব বিষয় সামনে আসছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
চাঁদাবাজির জেরে খুন
শনিবার দুপুরে শহরের বিজিবি ক্যাম্প সংলগ্ন পল্লন কাটা এলাকায় গণেশ পাল (৪০) নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগ ওঠে। নিহত গণেশ পাল ওই এলাকার বাসিন্দা বিশ্বনাথ পালের ছেলে।
পরিবারের অভিযোগ, তাদের বাড়িতে সেপটিক ট্যাংক নির্মাণের কাজ চলাকালে জিদান নামে এক ব্যক্তি চাঁদা দাবি করেন। গণেশ পাল চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে শনিবার দুপুরে অভিযুক্ত জিদান ও তার সহযোগী বাড়িতে গিয়ে হামলা চালায় এবং তাকে ছুরিকাঘাত করে। গুরুতর আহত অবস্থায় গণেশ পালকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহতের স্বজনরা দ্রুত অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি উদয় শংকর পাল মিন্টু বলেন, এ ধরনের ঘটনা সমাজে আতঙ্ক তৈরি করছে। অপরাধীদের কঠোরভাবে দমন না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
পারিবারিক কলহের জেরে আত্মহত্যা?
একই দিন সকালে শহরের দক্ষিণ কলাতলী এলাকায় গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় কায়সার (৩০) নামে এক ইজিবাইক চালকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার বাসিন্দা হলেও জীবিকার তাগিদে কক্সবাজারে বসবাস করতেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকট ও ধার-দেনার কারণে কায়সারের পরিবারে অশান্তি চলছিল। সেহরির সময় স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ার একপর্যায়ে তিনি স্ত্রীকে বাপের বাড়ি থেকে টাকা এনে দিতে বলেন। স্ত্রী কিছুক্ষণ বাইরে যাওয়ার পর ফিরে এসে দেখতে পান ঘরের দরজা বন্ধ এবং জানালা দিয়ে দেখা যায় কায়সার গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ঝুলছেন।
পরে পুলিশ এসে মরদেহ উদ্ধার করে সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, পারিবারিক কলহের জেরে অভিমান করে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। তবে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
হাসপাতালে নিখোঁজ নারীর রহস্যজনক মৃত্যু
একই দিনে আরেকটি ঘটনাও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। চার দিন ধরে নিখোঁজ থাকার পর কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের লিফটের নিচ থেকে কহিনুর আক্তার (৩২) নামে এক নারীর রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
কহিনুর উখিয়া উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়নের দক্ষিণ ডেইলপাড়া এলাকার বাসিন্দা। তিনি তার সাত বছর বয়সী মেয়েকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করানোর পর গত ৩ মার্চ থেকে নিখোঁজ ছিলেন। পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরিও করা হয়।
স্বজনরা জানান, হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় নিখোঁজ হওয়ার দিন তিনি হাসপাতালের চারতলার লিফটে প্রবেশ করেছিলেন। এরপর তাকে আর কোথাও দেখা যায়নি। পরে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে লিফটের নিচে তার মরদেহ পাওয়া যায়।
এই মৃত্যু নিয়ে রহস্য তৈরি হয়েছে। এটি লিফট দুর্ঘটনা, নাকি অন্য কোনো কারণে মৃত্যু তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্বজনরা।
একদিনে তিনটি ভিন্ন ঘটনার মরদেহ সদর হাসপাতালে পৌঁছানোয় কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের মতে, শহরে চাঁদাবাজি, ছোটখাটো বিরোধের সহিংস রূপ নেওয়া, আর্থিক সংকট এবং মানসিক চাপ এসব সমস্যার কারণে অপরাধ ও আত্মহত্যার ঘটনা বাড়ছে।
সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত নগরায়ন, বেকারত্ব এবং নিম্ন আয়ের মানুষের আর্থিক সংকট সামাজিক অস্থিরতাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর ফলে ছোটখাটো বিরোধও অনেক সময় ভয়াবহ ঘটনার জন্ম দিচ্ছে।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ছমি উদ্দিন জানান, ঘটনাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে আত্মহত্যা ও রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনাগুলোর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রতিটি ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে পুলিশ কাজ করছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, কক্সবাজারে অপরাধ ও সামাজিক অস্থিরতা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।