হরমুজ বিশ্বকে আটকে দিচ্ছে ইরান
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালী এখন এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক লড়াইয়ের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ইরান সম্প্রতি এই সংকীর্ণ জলপথে যাতায়াতকারী জাহাজের ওপর টোল বা শুল্ক আরোপের ইঙ্গিত দিয়েছে, যা বিশ্ব সামুদ্রিক বাণিজ্যের বিদ্যমান নিয়মকানুনকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। তেহরান এই পদক্ষেপকে যুদ্ধের বিশেষ পরিস্থিতি বলে দাবি করলেও বিশেষজ্ঞরা একে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন।
সম্প্রতি ইরান ও ওমান এই প্রণালীর ট্রাফিক পর্যবেক্ষণের জন্য একটি যৌথ প্রটোকল খসড়া চূড়ান্ত করেছে। তেহরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, তারা শত্রু দেশগুলোর জন্য এই পথ দীর্ঘমেয়াদী বন্ধ রাখার পরিকল্পনা করছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি জাহাজের জন্য এই জলপথ ব্যবহারের সুযোগ সীমিত করার হুমকি দিয়েছে দেশটি। এই ঘোষণার পর থেকেই আন্তর্জাতিক মহলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, কারণ এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন বিশেষজ্ঞ সঞ্জিত রুহাল জানিয়েছেন যে, ইরান বা ওমান এই প্রণালীর সার্বভৌম অংশীদার হলেও তাদের এককভাবে টোল আদায়ের কোনো আইনি অধিকার নেই। জাতিসংঘের সমুদ্র আইন বিষয়ক কনভেনশন বা আনক্লস অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক নেভিগেশনের জন্য ব্যবহৃত এই ধরণের প্রণালীগুলোতে সকল দেশের জাহাজের অবাধ ও নিরবচ্ছিন্ন চলাচলের অধিকার রয়েছে। কোনো রাষ্ট্র শুধুমাত্র যাতায়াতের জন্য কোনো ফি বা কর আদায় করতে পারে না, যদি না তারা বিশেষ কোনো সেবা প্রদান করে।
যুদ্ধের দোহাই দিয়ে ইরান এই বৈশ্বিক নীতি বদলে দেওয়ার যে চেষ্টা করছে, তা দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সংঘাতের কারণে এই পথে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল ইতিমধ্যে ৯৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে বিশ্ব বাজারে জ্বালানির দাম এবং শিপিং বিমার খরচ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরান এখন দাবি করছে যে, যুদ্ধের সময়ে সাধারণ শান্তির নিয়ম প্রযোজ্য হতে পারে না, যা মূলত তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে একটি সাফাই মাত্র।
কৌশলগত দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, হরমুজ প্রণালীই এখন ইরানের হাতে থাকা অন্যতম বড় তুরুপের তাস। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত ইরান এই টোল ব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন আয়ের উৎস তৈরির পাশাপাশি একটি শক্তিশালী দর কষাকষির হাতিয়ার তৈরি করতে চাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি এখানে সফল হয়, তবে বিশ্বের অন্যান্য বিতর্কিত জলপথগুলোতেও একই ধরণের সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে, যা বিশ্ব বাণিজ্যকে চরম অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেবে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ইতিমধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ এই পথে চলাচল করার চেষ্টা করলে তা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু বাণিজ্যিক জাহাজ আক্রমণের শিকার হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা এই এলাকায় নৌ-নিরাপত্তাকে তলানিতে নিয়ে ঠেকিয়েছে। তেহরান স্পষ্ট করে বলছে যে, এই পথ বিশ্বের জন্য খোলা থাকলেও তাদের শত্রুদের জন্য তা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে, যা বৈষম্যহীন সামুদ্রিক চলাচলের আন্তর্জাতিক সংজ্ঞাকে সরাসরি অস্বীকার করে।
এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে ভারত, চীন এবং ইউরোপের দেশগুলো গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। কারণ এই দেশগুলো তাদের জ্বালানি আমদানির জন্য পুরোপুরি হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে জর্ডান ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলো এই সংকট এড়াতে পাইপলাইনের মতো বিকল্প পথের দিকে ঝুঁকছে। তবে রাতারাতি হরমুজ প্রণালীর বিকল্প তৈরি করা অসম্ভব বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। পশ্চিমা শক্তিগুলো এই প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরব হলেও চীনের মতো দেশগুলো এই পরিস্থিতির জন্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করছে।
সূত্র: টিআরটি