শনিবার, ১লা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৭ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আর্ন্তজাতিক

ইরান বাব আল-মান্দেবও বন্ধ করে দিলে কি হবে?

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার পারদ এবার বিশ্ব অর্থনীতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালীর পর এবার কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব সমুদ্রপথটি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে ইরান।

দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির অন্যতম শীর্ষ উপদেষ্টা আলি আকবর বেলায়েতি রবিবার এই হুঁশিয়ারি দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করে জানান, ‘প্রতিরোধ ফ্রন্ট’ বা ইরানের মিত্ররা এখন বাব আল-মান্দেব হরমুজ প্রণালীর মতোই গুরুত্ব দিচ্ছে এবং প্রয়োজনে এটি অবরোধ করতে তারা দ্বিধাবোধ করবে না।

ইরানের এই হুমকির নেপথ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের চরম দ্বন্দ্ব। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে সরাসরি হুমকি দিয়েছেন যে, তেহরান যদি হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে না দেয়, তবে চলতি সপ্তাহের বুধবার থেকে ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সেতুগুলোতে ভয়াবহ বোমা হামলা চালানো হবে। ট্রাম্পের এই অনমনীয় অবস্থানের জবাবেই ইরান এখন তাদের প্রভাববলয়ে থাকা হুথি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দেব ঢাল হিসেবে ব্যবহারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ইয়েমেনভিত্তিক এই গোষ্ঠীটি এরই মধ্যে ইসরায়েলের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছে।
বাব আল-মান্দেব প্রণালীটি শুধু একটি সমুদ্রপথ নয়, এটি বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম লাইফলাইন। মাত্র ২৯ কিলোমিটার চওড়া এই সরু পথটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ হরমুজ প্রণালী আংশিক বন্ধ হওয়ার পর সৌদি আরবসহ অনেক দেশ তাদের তেল রপ্তানির জন্য এই পথটিকেই বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করছে। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের ৫ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই মুহূর্তে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব উভয় পথ যদি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে, তবে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের অন্তত এক-চতুর্থাংশ বা ২৫ শতাংশ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।

জ্বালানি তেলের বাইরেও এই উত্তেজনার প্রভাব পড়বে সাধারণ পণ্য সরবরাহে। চীন, ভারত ও এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকে ইউরোপে পাঠানো কন্টেইনারবাহী জাহাজগুলোর ১০ শতাংশ এই পথ দিয়েই চলাচল করে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, লোহিত সাগরের এই পথে যদি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। এর ফলে জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দামের পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে। কারখানা থেকে শুরু করে রান্নাঘর এবং পেট্রোল পাম্প, সবখানেই এই সংকটের ঢেউ লাগবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে একটি ‘দুঃস্বপ্ন’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ এলিজাবেথ কেন্ডাল আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, যদি দুটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ একই সাথে অবরুদ্ধ হয়, তবে ইউরোপের বাণিজ্য পঙ্গু হয়ে যেতে পারে। যদিও হুথি বিদ্রোহীরা এখনই পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে জড়াবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে, তবুও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই মুখোমুখি অবস্থান বিশ্বকে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দার দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

সূত্র: আল জাজিরা

ক্যাটাগরি