শনিবার, ১লা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৭ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টেকনাফ

টেকনাফ মানবপাচারের অন্ধকার করিডোর: অভিযান বাড়লেও থামছে না সিন্ডিকেট

বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের সীমান্ত উপজেলা টেকনাফ। একদিকে নাফ নদী, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগর। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে বৈধ বাণিজ্যের পাশাপাশি মানবপাচারকারীদের অন্যতম সক্রিয় রুটে পরিণত হয়েছে। বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরি, উন্নত জীবনের স্বপ্ন কিংবা কম খরচে মালয়েশিয়া পৌঁছে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সংঘবদ্ধ চক্র প্রতি বছর শত শত মানুষকে মৃত্যুঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযান, গ্রেপ্তার ও উদ্ধার সত্ত্বেও মানবপাচারের শিকড় পুরোপুরি উপড়ে ফেলা যায়নি।

২০২৬ সালের এপ্রিলে টেকনাফ থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া একটি ট্রলারে প্রায় ২৭০–২৮০ জন বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা যাত্রা করেন। আন্দামান সাগরে ট্রলারটি ডুবে গেলে অধিকাংশ যাত্রী নিখোঁজ হন। জীবিত উদ্ধার হন মাত্র ৯ জন। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রলারে অতিরিক্ত যাত্রী তোলা, অমানবিক পরিবেশ, শ্বাসরোধ, নির্যাতন এবং মুক্তিপণ আদায় ছিল পুরো যাত্রার অংশ। এই ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়; এটি টেকনাফকেন্দ্রিক মানবপাচার নেটওয়ার্কের ভয়াবহতার প্রতীক হয়ে ওঠে।

টেকনাফে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একাধিক বড় অভিযান চালিয়েছে।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে বাহারছড়ার পাহাড়ি এলাকার একটি বাড়ি থেকে পুলিশ ৬৬ জনকে উদ্ধার করে। তাদের মধ্যে ৬১ জন ছিলেন রোহিঙ্গা এবং ৫ জন বাংলাদেশি। একই অভিযানে মানবপাচারকারী চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে ৩৭ জনই ছিল শিশু।

২০২৫ সালের নভেম্বরে বাহারছড়ার জুম্মাপাড়া সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকা থেকে কোস্ট গার্ড ও নৌবাহিনীর যৌথ অভিযানে নারী ও শিশুসহ ২৫ জনকে উদ্ধার করা হয়। অভিযোগ ছিল, তাদের মালয়েশিয়ায় পাচারের জন্য আটকে রাখা হয়েছিল এবং পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ে নির্যাতন করা হচ্ছিল। দুই পাচারকারীকে আটক করা হয়।

একই বছরের নভেম্বরে বাহারছড়ার কচ্ছপিয়া ঘাট এলাকায় আরও ২৮ জন নারী ও শিশুকে উদ্ধার করা হয়। যদিও পাচারকারীরা পালিয়ে যায়, প্রশাসন জানায়, উপকূলজুড়ে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

ডিসেম্বরে টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের রাজাছড়া এলাকায় বিজিবি ট্রলারে তোলার আগমুহূর্তে ১৮ জনকে উদ্ধার করে। বিজিবি জানায়, এই চক্রের মালয়েশিয়াতেও প্রতিনিধি রয়েছে, যারা বাংলাদেশ থেকে পাঠানো ব্যক্তিদের গ্রহণ করে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাহারছড়া উপকূলে কোস্ট গার্ডের অভিযানে নারী ও শিশুসহ ৫৫ জনকে উদ্ধার এবং পাঁচ পাচারকারীকে আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের বিদেশে চাকরি ও উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর প্রস্তুতি চলছিল।

ফেব্রুয়ারির আরেক অভিযানে বাহারছড়ার একটি বাড়ি থেকে ১৫ জনকে উদ্ধার করে কোস্ট গার্ড ও র‍্যাব।

মার্চে বাহারছড়ার নোয়াখালী জুম্মাপাড়ার একটি পেঁপে বাগান থেকে ৩২ জনকে উদ্ধার করা হয়। পাচারকারীরা পালিয়ে গেলেও ভুক্তভোগীরা জানান, বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কয়েকদিন আটকে রাখা হয়েছিল।

জুনে বাহারছড়া উপকূলে আরেকটি বড় অভিযানে মালয়েশিয়াগামী ট্রলার থেকে ৫০ জনকে উদ্ধার এবং ৯ জন সন্দেহভাজন পাচারকারীকে আটক করে কোস্ট গার্ড। উদ্ধার হওয়া ৫০ জনের মধ্যে ৩৯ জন বাংলাদেশি এবং ১১ জন রোহিঙ্গা ছিলেন।

উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বক্তব্যে একটি অভিন্ন চিত্র উঠে আসে। প্রথমে বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন। এরপর টেকনাফের পাহাড়ি এলাকা, নির্জন বাড়ি বা উপকূলের গোপন আস্তানায় কয়েকদিন আটকে রাখা। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়। তারপর গভীর রাতে ট্রলারে তুলে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা। অনেক ট্রলার গন্তব্যে পৌঁছালেও কিছু ট্রলার ঝড়, অতিরিক্ত যাত্রী বা অন্যান্য কারণে সাগরে বিপর্যস্ত হয়।

কোস্ট গার্ড ও বিজিবির কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছেন, মানবপাচার রোধে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং বাহারছড়া, শাহপরীর দ্বীপ ও টেকনাফ উপকূলে নিয়মিত বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের টেকনাফ মডেল থানায় হস্তান্তর করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং পাচারচক্রের অন্যান্য সদস্যদের শনাক্তে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

উখিয়া-টেকনাফ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, টেকনাফের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে মানবপাচারসহ নানা অপরাধের কারণে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। বিষয়টি তিনি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নজরে এনেছেন এবং মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ও সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মানবপাচার প্রতিরোধে জেলা প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। দালালচক্রের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের সহায়তা এবং সীমান্ত এলাকায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করা হচ্ছে।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানান, সীমান্তবর্তী এলাকায় মানবপাচার প্রতিরোধে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে।

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ভুক্তভোগীদের উদ্ধারের পাশাপাশি জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মানবপাচারসংক্রান্ত যেকোনো তথ্য পুলিশকে জানাতে তিনি সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানান।

বিশ্লেষকদের মতে, টেকনাফের দীর্ঘ উপকূল, সীমান্তবর্তী অবস্থান, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, রোহিঙ্গা সংকট এবং বিদেশে যাওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা—এই পাঁচটি কারণ মানবপাচারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। একটি সিন্ডিকেট ভেঙে গেলেও দ্রুত নতুন সদস্য যুক্ত হয়ে আবার একই কার্যক্রম শুরু করছে।

মানবপাচার রোধে শুধু অভিযান যথেষ্ট নয়। সীমান্ত এলাকায় টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নিরাপদ বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বৃদ্ধি, দালালচক্রের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ধ্বংস, দ্রুত বিচার এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতা বাড়াতে হবে। অন্যথায় উদ্ধার অভিযান চললেও মৃত্যুর মিছিলে নতুন নতুন মানুষ যোগ হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

টেকনাফ আজ শুধু একটি সীমান্ত উপজেলা নয়; এটি মানবপাচারবিরোধী লড়াইয়েরও এক কঠিন পরীক্ষাক্ষেত্র। প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযান আশার বার্তা দিলেও এই অন্ধকার ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ করতে হলে সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদি ও কঠোর পদক্ষেপের বিকল্প নেই।

ক্যাটাগরি