শুক্রবার, ১১ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৭শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাতীয়

ঢেউ পেরিয়ে এশিয়ান গেমসের স্বপ্ন, ইতিহাস গড়ার অপেক্ষায় ফাতেমা-মান্নান

সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ জয় করে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে লাল-সবুজের পতাকা ওড়ানোর নতুন ইতিহাসের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশের দুই তরুণ সার্ফার ফাতেমা আক্তার ও মো. মান্নান। আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর জাপানের আইচি-নাগোয়ায় অনুষ্ঠিতব্য এশিয়ান গেমসে প্রথমবারের মতো সার্ফিং ইভেন্টে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন তারা।

ফাতেমা আক্তার দেশের প্রথম নারী সার্ফার এবং মো. মান্নান প্রথম পুরুষ সার্ফার হিসেবে এশিয়ান গেমসে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন মাইলফলক স্থাপন করতে যাচ্ছেন। তাদের এই যাত্রা শুধু একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সামাজিক বাধা, পারিবারিক চাপ, আর্থিক সংকট, প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা এবং স্বপ্ন পূরণের জন্য দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প।

এশিয়ান গেমস সামনে রেখে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে এখন চলছে তাদের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। প্রতিদিন সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে নিজেদের আরও নিখুঁত করে তুলছেন দুজন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতার জন্য পর্যাপ্ত আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা না থাকলেও সীমিত সুযোগের মধ্যেই নিজেদের সর্বোচ্চ প্রস্তুত করার চেষ্টা করছেন তারা।

এশিয়ান গেমসে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জনের পথে নিজেদের সামর্থ্যেরও প্রমাণ দিয়েছেন ফাতেমা ও মান্নান। ২০২৬ সালের জাতীয় সার্ফিং প্রতিযোগিতায় নিজ নিজ বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়ে তারা এশিয়ান গেমসের টিকিট নিশ্চিত করেন।

ফাতেমা আক্তারের পথচলাটা ছিল আরও কঠিন। নারী হিসেবে সার্ফিংয়ের মতো ঝুঁকিপূর্ণ ও তুলনামূলকভাবে অপরিচিত খেলায় আসায় শুরু থেকেই সামাজিক নানা নেতিবাচক মন্তব্যের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে ও তার পরিবারকে। আশপাশের মানুষের কটু কথা এবং নানা প্রশ্নের কারণে একসময় খেলা ছেড়ে দেওয়ার পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছিল।

ফাতেমা জানান, একপর্যায়ে পরিবারের পক্ষ থেকেও খেলা বন্ধ করার চাপ এসেছিল। বিশেষ করে মায়ের চাপের কারণে সার্ফিং থেকে দূরে সরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কোচ রাশেদ আলমের সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণায় আবারও অনুশীলনে ফেরেন। এরপর ধীরে ধীরে নিজের দক্ষতা দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে জায়গা করে নেন এবং শেষ পর্যন্ত দেশের প্রথম নারী সার্ফার হিসেবে এশিয়ান গেমসে অংশ নেওয়ার সুযোগ অর্জন করেন।

নিজের স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে ফাতেমা বলেন, শুধু ছেলেরা নয়, সুযোগ পেলে মেয়েরাও যে দেশের জন্য আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্য বয়ে আনতে পারে, জাপানে গিয়ে সেটাই প্রমাণ করতে চান তিনি।

ফাতেমার মতোই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগিয়ে এসেছেন মো. মান্নানও। আর্থিক সংকট এবং পর্যাপ্ত স্পন্সরশিপের অভাব তার প্রস্তুতির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় নিজের খরচেই অনুশীলন চালিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। দেশের বাইরে আধুনিক ও পেশাদার সার্ফিং প্রশিক্ষণের সুযোগ সীমিত হলেও হাল ছাড়েননি তিনি।

কক্সবাজারের সমুদ্রেই দেশীয় কোচ রাশেদ আলমের অধীনে নিয়মিত অনুশীলন করছেন মান্নান। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সার্ফারদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আরও উন্নত প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তারপরও দেশের হয়ে সর্বোচ্চটা দেওয়ার প্রত্যয় নিয়ে প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছেন এই তরুণ।

তবে এশিয়ান গেমসের আগে ফাতেমা ও মান্নানের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন তাদের কোচকে ঘিরে। দুজনের দাবি, জাপানে তাদের সঙ্গে মূল কোচ রাশেদ আলমকে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কারণ সার্ফিং এমন একটি খেলা, যেখানে প্রতিযোগিতার সময় পানিতে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত, কৌশলগত নির্দেশনা এবং ভুল সংশোধনে কোচের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) ও সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাজেট-স্বল্পতার কারণে দুই সার্ফারের সঙ্গে মাত্র একজন অফিসিয়াল পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ওই কর্মকর্তা একই সঙ্গে কোচ ও ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু ফাতেমা ও মান্নানের মতে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের সেরা পারফরম্যান্স দিতে হলে দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষক ও মূল কোচ রাশেদ আলমের উপস্থিতি প্রয়োজন।

তাদের ভাষ্য, কক্সবাজারের সমুদ্রে দীর্ঘদিন ধরে যে কোচ তাদের প্রস্তুত করেছেন, তাদের সক্ষমতা, দুর্বলতা ও প্রতিযোগিতার কৌশল সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো জানেন তিনিই। তাই জাপানে গিয়ে প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তার তাৎক্ষণিক নির্দেশনা পেলে পারফরম্যান্সে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বাংলাদেশের জন্য এবারের এশিয়ান গেমস তাই শুধু আরেকটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসর নয়; সার্ফিংয়ে দেশের অভিষেকেরও মঞ্চ। এই দুই তরুণের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে।

ফাতেমা ও মান্নানের সামনে এখন একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার কঠিন চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে তেমনি রয়েছে নিজেদের দীর্ঘদিনের সংগ্রামকে সাফল্যে রূপ দেওয়ার সুযোগ। সামাজিক বাধা, পারিবারিক চাপ, আর্থিক সংকট কিংবা প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা—সবকিছু পেছনে ফেলে তারা এখন তাকিয়ে আছেন এশিয়ান গেমসের মঞ্চের দিকে।

কক্সবাজারের ঢেউয়ে প্রতিদিনের অনুশীলন থেকে জাপানের আন্তর্জাতিক মঞ্চ—এই পথচলার শেষ লক্ষ্য একটাই, দেশের জন্য স্মরণীয় কিছু করা। লাল-সবুজের পতাকা বুকে নিয়ে এশিয়ান গেমসে নিজেদের সেরাটা দিয়ে বাংলাদেশের সার্ফিংকে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন ফাতেমা আক্তার ও মো. মান্নান।

ক্যাটাগরি