কক্সবাজার বিমানবন্দর রানওয়ে সম্প্রসারণে মহেশখালী চ্যানেলে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও বকেয়া রাজস্ব আদায়ের সুপারিশ
কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্প গত কয়েক বছরে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে মহেশখালী চ্যানেলের ভেতরে বিভিন্ন সহায়ক স্থাপনা নির্মাণ করা হয়—যার মধ্যে পাইলিং, অস্থায়ী জেটি, সামগ্রী পরিবহনের সুবিধার্থে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ও কাঠামো উল্লেখযোগ্য। এসব স্থাপনা নির্মাণের ফলে নৌচ্যানেলের স্বাভাবিক প্রবাহ ও গভীরতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। নৌযান চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হওয়া, জাহাজের ড্রাফটে সমস্যা সৃষ্টি হওয়া, নাব্যতা কমে যাওয়াসহ নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় বিআইডব্লিউটিএ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে।
এই পরিস্থিতি যাচাই–বাছাই করতে বিআইডব্লিউটিএ একটি কমিটি গঠন করে। সেই কমিটি দীর্ঘসময় ধরে মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শন, নৌপথের গভীরতা পরিমাপ, পাইলিং কাঠামোর অবস্থান, নৌযান চলাচলের জটিলতা, সেখানকার স্থানীয় জেলেদের মতামত, সামুদ্রিক জোয়ার–ভাটার পরিবর্তন এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে তাদের প্রতিবেদন প্রস্তুত করে। তদন্তে দেখা যায়—রানওয়ে সম্প্রসারণের কাজে বেবিচকের তত্ত্বাবধানে এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মহেশখালী চ্যানেলে যেসব স্থাপনা নির্মিত হয়েছে, তাদের বেশ কিছু নৌপথের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে পাইলিং কাঠামোগুলো জোয়ারের সময় পানির গতিপথ বাধাগ্রস্ত করছে এবং ভাটায় সেডিমেন্টেশনের হার দ্রুত বাড়িয়ে তুলছে। এর ফলে চ্যানেলের নাব্যতা হ্রাস পেয়ে ভবিষ্যতে বড় জাহাজ চলাচল ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
কমিটির সুপারিশে স্পষ্টভাবে বলা হয়—চ্যানেলের ভেতরে বিমান অবতরণ সহায়ক কাঠামো হিসেবে যেসব পাইলিং বা জেটি নির্মিত হয়েছে, সেগুলো দ্রুত অপসারণ করা জরুরি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে পত্র দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। যদি বেবিচক নিজ উদ্যোগে এসব স্থাপনা অপসারণ না করে, তাহলে বিআইডব্লিউটিএ যেন তাদের নিজস্ব ব্যবস্থায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে—তাও সুপারিশে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
রানওয়ে সম্প্রসারণের কারণে ভবিষ্যতে মহেশখালী চ্যানেলের ওপর দীর্ঘমেয়াদি কী প্রভাব পড়তে পারে তা নিশ্চিত করতে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা করার কথা প্রতিবেদনে জোর দেওয়া হয়েছে। এই সমীক্ষার আওতায় জলবিদ্যুৎ বিশ্লেষণ, পলি পরিবহন মডেলিং, প্রবাহ বাধার কারণে পানির স্বাভাবিক গতিপথের পরিবর্তন, পরিবেশগত ক্ষতি, জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব, স্থানীয় জেলেদের জীবন–জীবিকার ঝুঁকি, সামাজিক ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রভৃতি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই সমীক্ষার অর্থায়নের দায়িত্ব বেবিচকের হওয়া উচিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কারণ প্রকল্পের কারণে এসব প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে।
বিমানবন্দর সম্প্রসারণের সময় ফোরশোর ভূমি ব্যবহার, সামগ্রী লোডিং–আনলোডিং এবং অস্থায়ী জেটি ব্যবহারের জন্য বিআইডব্লিউটিএ’র পাওনা রাজস্বও প্রতিবেদনে গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়। ভ্যাট, আয়করসহ মোট ৪ কোটি ১২ লাখ ৬৩ হাজার ৮৩৭ টাকা বেবিচকের কাছে বকেয়া রয়েছে। এই টাকা দ্রুত আদায়ে পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ কমিটি দিয়েছে।
এ ছাড়া মহেশখালী চ্যানেল রক্ষায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিআইডব্লিউটিএ, পরিবেশ অধিদপ্তর, পরিবেশ–বন–জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, বেবিচক, বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, কোস্টগার্ডসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। তবে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হলেও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক অগ্রগতি হয়নি বলে কমিটি জানিয়েছে।
এ কারণে কমিটি সুপারিশ করে—চ্যানেলের নাব্যতা, পরিবেশ ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে জরুরি ভিত্তিতে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা ডেকে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে এবং দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। পুরো প্রতিবেদনে মহেশখালী চ্যানেলের অস্তিত্ব রক্ষা ও নৌযান চলাচল অব্যাহত রাখাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।