মামলা ‘কাগজে’, মাঠে দখল অব্যাহত: মহেশখালীতে ৫ হাজার একর প্যারাবন লুটে বেপরোয়া সিন্ডিকেট
মামলা হয়েছে কিন্তু গ্রেফতার নেই আর সেই সুযোগে মহেশখালীর প্যারাবনে দখলদারদের তৎপরতা এখন আগের চেয়েও বেপরোয়া। স্থানীয়দের অভিযোগ, আসামিদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না থাকায় দিনে-রাতে অব্যাহতভাবে প্যারাবন কাটা, মাটি ভরাট ও দখল চলছে। এমনকি মামলা হওয়ার পর কিছু এলাকায় দখলের গতি আরও বেড়েছে। ফলে গোরকঘাটা, কুতুবজোম ও সোনাদিয়া উপ-দ্বীপজুড়ে প্রায় ৫ হাজার একর ম্যানগ্রোভ বনভূমি এখন প্রকাশ্য লুটের শিকার।
গত ২ এপ্রিল মহেশখালী থানায় উপকূলীয় বন বিভাগের দায়ের করা মামলায় ৩০ জনের নাম উল্লেখ করা হলেও আরও ১৫-২০ জনকে অজ্ঞাত রাখা হয়েছে। মামলাটি করেন ডেপুটি রেঞ্জ কর্মকর্তা ও গোরকঘাটা বনবিটের প্রধান কর্মকর্তা বিভাষ কুমার। তবে শুরু থেকেই প্রশ্ন এটি কি শুধু দায়সারা পদক্ষেপ? প্রকৃত ‘রাঘব বোয়াল’দের আড়াল করতেই কি তালিকা অপূর্ণ রাখা হয়েছে?
স্থানীয় সূত্র বলছে, রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল বানিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে এই দখলযজ্ঞ। বন কেটে ফেলা, মাটি ভরাট, এরপর দখল এই ‘মডেলেই’ একের পর এক এলাকা গিলে খাচ্ছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
অভিযোগ রয়েছে, কুতুবজোম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শেখ কামাল, প্রয়াত নেতা আনোয়ার পাশা চৌধুরীর ছেলে মোস্তফা আনোয়ার চৌধুরী ও মহসিন আনোয়ার চৌধুরীসহ প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যক্তি এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু তাদের নাম মামলায় স্পষ্টভাবে না থাকায় জনমনে ক্ষোভ ও সন্দেহ বাড়ছে।
সোনাদিয়ায় অভিযান চালিয়ে দু’জনকে গ্রেফতার করা হলেও স্থানীয়রা জানা, এটি লোক ‘দেখানো অ্যাকশন’। প্রকৃত হোতারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে, বরং আগের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কাটা গাছের জায়গায় দ্রুত মাটি ভরাট করে দখল পোক্ত করা হচ্ছে। কোথাও তৈরি হচ্ছে চিংড়ি ঘের, কোথাও বসতভিটা বা বাণিজ্যিক স্থাপনা। বন বিভাগের মামলা যেন দখলদারদের কাছে কোনো বাধাই নয় বরং ‘ঝুঁকি ম্যানেজ’ করে কাজ চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, মহেশখালীর এই প্যারাবন উপকূলীয় অঞ্চলের ‘প্রাকৃতিক ঢাল’। এটি ধ্বংস হলে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষতি বহুগুণ বাড়বে, লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়বে কৃষিজমিতে, হুমকিতে পড়বে জীববৈচিত্র্য ও মানুষের বসতি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে বন দখল চললেও কার্যকর হস্তক্ষেপ দেখা যায়নি। প্রভাবশালীদের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই অভিযান থেমে যায় বা শিথিল হয়ে পড়ে এমন অভিযোগও রয়েছে।
পরিবেশবাদী ও সচেতন নাগরিকদের দাবি ‘নামধারী’ নয়, প্রকৃত হোতাদের ধরুন এবং মামলার অজ্ঞাত আসামিদের দ্রুত শনাক্ত করে প্রভাবশালী দখলদারদের নাম প্রকাশ করুন। একই সাথে তাৎক্ষণিক গ্রেফতার অভিযান শুরু করার দাবী তাদের।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, “অভিযান চলছে।” কিন্তু মাঠের চিত্র ভিন্ন কথা বলছে, আইন থেমে আছে কাগজে, আর প্যারাবন হারাচ্ছে বাস্তবে।