র্যাবের অভিযানে বিপুল ইয়াবা জব্দ : সক্রিয় চক্র নিয়ে নতুন প্রশ্ন
‘ঢাকাইয়া দম্পতির’ গোপন সিন্ডিকেটের অনুসন্ধান
কক্সবাজার শহরের ১নং ওয়ার্ডের সমিতিপাড়া এলাকায় র্যাব-১৫ এর অভিযানে ৬০ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধারের ঘটনায় আলোচনায় এসেছে ওই এলাকার দীর্ঘদিনের মাদক সিন্ডিকেট। স্থানীয়দের দাবি, এ ঘটনায় শুধু একক কোনো কারবারি নয়, বরং বৃহৎ একটি নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে, যার সঙ্গে জড়িত কথিত ‘ঢাকাইয়া দম্পতি’সহ একাধিক চক্র।
র্যাব সূত্র জানায়, গত ৪ এপ্রিল ২০২৬ ভোরে সিপিসি-১, টেকনাফ ক্যাম্পের একটি দল সমিতিপাড়ায় নবাব মিয়ার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৬০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে। তবে অভিযানের সময় প্রধান আসামি পালিয়ে যায়। উদ্ধারকৃত ইয়াবার ওজন প্রায় ৫.৫ কেজি।
স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, সমিতিপাড়া এলাকা দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবারিদের নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকার এক দম্পতি বরিশালের ইলিয়াছ ও তার স্ত্রী কানিজ ফাতেমা এ এলাকায় বসতি গড়ে তুলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইয়াবা পাচার করে আসছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর আগে ঢাকায় মাদক মামলার পর আত্মগোপনে কক্সবাজারে এসে বসবাস শুরু করেন কানিজ ফাতেমা। পরে স্বামী ইলিয়াছকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলেন একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। এলাকাবাসীর কাছে তিনি ‘ইয়াবা রানী’ নামেও পরিচিত।
অভিযোগ রয়েছে, এই দম্পতি সমিতিপাড়ার বিভিন্ন গলিতে ভাড়া বাসা পরিবর্তন করে শেষে নিজস্ব বাড়ি নির্মাণ করেন। বর্তমানে তাদের নামে-বেনামে জমি, গাড়ি, ট্রলারসহ বিপুল সম্পদের মালিকানা রয়েছে। যদিও দৃশ্যমান কোনো বৈধ আয়ের উৎস নেই।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা (ছদ্মনামে) জানান, নিয়মিত ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন তাদের বাসায় আসা-যাওয়া করে। অনেক ক্ষেত্রে গাড়ি করে নারীসহ সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আনাগোনা লক্ষ্য করা যায়। তাদের ভাষ্য, “হঠাৎ করেই এই দম্পতির জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, যা স্বাভাবিক নয়।”
আরেকজন বাসিন্দার অভিযোগ, মাদক পাচারের কৌশল হিসেবে মাছের খাবার (ঘুরি) বা অন্যান্য পণ্যের আড়ালে ইয়াবা দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। এমনকি সাগরপথেও ট্রলার ব্যবহার করে মাদক আনার অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে সাবেক এক মাদক কারবারি (ছদ্মনাম) দাবি করেন, তিনি একসময় কানিজ ফাতেমার সঙ্গে কাজ করতেন। তার ভাষ্য, “আমি এখন এই ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছি, কিন্তু তারা এখনও সক্রিয়। বিভিন্ন মাধ্যমে ইয়াবা সংগ্রহ করে ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় পাঠায়।”
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে কানিজ ফাতেমা পূর্বে দাবি করেছিলেন, “আমি ছয় বছর আগে এই কাজ করতাম, এখন আর জড়িত নই।” অন্যদিকে তার স্বামী ইলিয়াছও অতীতে মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে দাবি করেন, তারা বৈধ ব্যবসা থেকে আয় করছেন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি তাদের নজরে এলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রশাসন নাজমুল সাকিব খান জানিয়েছেন, “মাদক কারবারিদের কোনো ছাড় নেই। অভিযোগের সত্যতা পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সচেতন মহলের মতে, শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে দোকানপাট সবখানেই মাদকের বিস্তার ঘটছে। এতে তরুণ সমাজ বিপথগামী হচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে।
সর্বশেষ র্যাবের এই বড় চালান উদ্ধারের ঘটনায় সমিতিপাড়াকেন্দ্রিক মাদক সিন্ডিকেট নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু অভিযান নয়, এই চক্রের মূল হোতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।