সদর থানা পুলিশের ‘অলআউট অ্যাকশন’
২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার ২৫, দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার
ছিনতাইকারী, পেশাদার চোর, পরোয়ানাভুক্ত আসামি ও মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান
রাত নামলেই নির্জন সড়কে ছিনতাইকারীদের উৎপাত, অলিগলিতে মাদকসেবীদের আড্ডা পর্যটন নগরী কক্সবাজারে অপরাধীদের এমন তৎপরতা ঠেকাতে এবার ‘অলআউট অ্যাকশনে’ নেমেছে সদর মডেল থানা পুলিশ। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে মাত্র ২৪ ঘণ্টার বিশেষ অভিযানে পেশাদার চোর, দেশীয় অস্ত্রধারী ছিনতাইকারী, পরোয়ানাভুক্ত আসামি ও মাদকসেবীসহ ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
শহরের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে একযোগে চালানো এ অভিযানে বেশ কিছু দেশীয় তৈরি ধারালো অস্ত্র, চাকু ও কাঠের লাঠি উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, এসব অস্ত্র অপরাধ সংঘটনে ব্যবহার করা হতো।
সদর থানা পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে একাধিক মামলার আসামিও রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা, দস্যুতা, দ্রুত বিচার আইন ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে মামলা রয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, পর্যটন নগরীর অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে বিশেষ অভিযান শুরু করা হয়। কলাতলী, নতুন বাহারছড়া, গাড়ির মাঠ, খুরুশকুল, রাজারকুল, সমিতিপাড়াসহ শহর ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় একযোগে অভিযান চালায় পুলিশের একাধিক টিম।
অস্ত্রধারী চোর ও ছিনতাইকারীসহ চক্রের আট সদস্য গ্রেপ্তার :
গ্রেপ্তার সাদ্দাম হোসেন (৩৬) চৌফলদন্ডীর বাসিন্দা। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে ২০২০ সালের একটি হত্যাচেষ্টা ও দস্যুতার মামলা রয়েছে। টেকপাড়ার ইরফান ফারদিন প্রকাশ ইরফান মোহাম্মদের (২২) বিরুদ্ধে বিস্ফোরক ও মারামারিসহ ছয়টি মামলা রয়েছে।
সাহিত্যিকা পল্লীর তালেব প্রকাশ কালার মাহমুদ বাবুল (৩২) ২০২২ সালের দস্যুতার প্রস্তুতির মামলার আসামি। এ ছাড়া টেকনাফের মো. আরিফ (২০) ও ঈদগাঁওয়ের মো. জাকির হোসেনের (২৪) বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে মামলা রয়েছে।
অভিযানে আরও গ্রেপ্তার করা হয়েছে মো. ইয়াছিন (৩৫), মো. নুরুল আজিম (১৯) ও মহেশখালীর নুরুল আজমকে (৩৪)।
ছিনতাইয়ের অভিযোগ, গ্রেপ্তার ১২ :
অভিযানে কলাতলীসহ বিভিন্ন পর্যটন পয়েন্ট থেকে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, তাদের অনেকেই রাতে পর্যটন এলাকা ও সংযোগ সড়কে ঘোরাফেরা করে মাদক সেবনের পাশাপাশি পথচারীদের হয়রানি ও ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ত।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন মুরাদ হাসান প্রকাশ কালু, ওসমান গণি, জিহাদুল ইসলাম, ইমরান, মো. সাজু, শহীদ প্রকাশ রবি, তারেক জিয়া প্রকাশ লালা, কেফায়েত উল্লাহ প্রকাশ রকি, মো. জালাল, মো. তারেক, সাইফুল ইসলাম শাউন ও রোবায়েত।
পরোয়ানাভুক্ত তিন আসামি আটক :
বিশেষ অভিযানে পরোয়ানাভুক্ত তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন মো. আমান উল্লাহ (৫০), দিদারুল আলম (৩৯) ও ইনতিসার ছিদ্দিকী সাজিম (২৯)।
এ ছাড়া ধর্তব্য অপরাধে পাহাড়তলীর মো. ওসমান (১৫) এবং নিয়মিত মামলায় সিলেটের গোলাপগঞ্জের মো. রাকিবকে (২৭) গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
‘অপরাধীর কোনো ঠাঁই হবে না’- ওসি :
সদর মডেল থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, “কক্সবাজার কেবল একটি জেলা শহর নয়, এটি কোটি পর্যটকের আস্থার জায়গা। এখানে অপরাধী বা মাদকের কোনো ঠাঁই হবে না। আমরা জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছি।”
তিনি বলেন, গত ২৪ ঘণ্টার অভিযান একটি বার্তা দিয়েছে—কোনো অপরাধী ছাড় পাবে না। অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক কিংবা যেখানেই লুকিয়ে থাকুক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। পর্যটক ও স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিতে রাত-দিন পুলিশের টহল ও বিশেষ টিম মাঠে থাকবে।
স্বস্তি ফিরছে ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের মধ্যে :
সদর থানা পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানে স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
টেকপাড়া এলাকার বাসিন্দা কাজী রফিকুল ইসলাম বলেন, রাতের বেলায় বিভিন্ন গলিতে ছিনতাই ও উঠতি বয়সী তরুণদের আড্ডা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ছিল। পুলিশের সাম্প্রতিক অভিযানে একসঙ্গে ২৫ জন গ্রেপ্তারের ঘটনায় নিরাপত্তাবোধ বেড়েছে।
কলাতলী বিচ, প্রপার্টি ও হোটেল-মোটেল জোন ব্যবসায়ী সমিতির সদস্য হাজী মো. জসিম উদ্দিন বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তাই কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবসার মূল ভিত্তি। রাতে পর্যটকরা যাতে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারেন, সে জন্য পুলিশের এই কঠোর অবস্থান অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
ভাসমান অপরাধীদের নিয়েও নজরদারি :
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পর্যটন শহর হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা কিছু ভাসমান অপরাধী কক্সবাজারের বিভিন্ন কলোনি ও আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায় অবস্থান নেয়। তাদের একটি অংশ মাদক সেবনের অর্থ জোগাড় করতে ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে বলে পুলিশের দাবি।
পুলিশের তদন্তে আরও উঠে এসেছে, কিছু ছিনতাইকারী চক্র রাতে নির্জন সড়ককে টার্গেট করে দেশীয় ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে পথচারীদের কাছ থেকে টাকা ও মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নিত।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পর্যটন নগরীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে নিয়মিত অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি ও রাতের টহল জোরদার করা জরুরি। সদর মডেল থানা পুলিশের সাম্প্রতিক সাঁড়াশি অভিযান অপরাধীদের মধ্যে চাপ সৃষ্টি করেছে এবং কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নতুন গতি তৈরি করেছে।