অসুস্থ অসহায় এতিম শিশুর পাশে আইনজীবী সমিতির সভাপতি মন্নান
দুনিয়ায় তার আপন বলতে কেউ নেই। মাথার ওপর নেই মা-বাবার স্নেহের ছায়া, নেই দাদা-দাদির আদর। অসুস্থ হলে মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার মতো আপনজনও নেই পাশে। মাত্র ১০ বছর বয়সেই জীবনের নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি তাসফিয়া জাহান মনিফা। দীর্ঘদিনের অসুস্থতা, পেটের তীব্র ব্যথা আর অর্থাভাবে চিকিৎসা না পাওয়ার যন্ত্রণা সব মিলিয়ে যেন ছোট্ট এই শিশুটির জীবন হয়ে উঠেছিল এক অসহায় লড়াই।
পেটের ব্যথায় কাতর হয়ে রাস্তার পাশে কান্নাকাটি করছিল মনিফা। চারপাশে ছিল মানুষের চলাচল, কিন্তু অসহায় শিশুটির যন্ত্রণা ভাগ করে নেওয়ার মতো আপনজন ছিল না। ঠিক সেই সময় আব্দুর রহিম নামের এক পথচারীর নজরে পড়ে শিশুটি। মানবিকতার টানে তিনি মনিফাকে হাসপাতালে ভর্তি করান। কিন্তু হাসপাতালে নেওয়ার পরও দেখা দেয় চিকিৎসার খরচ জোগাড়ের দুশ্চিন্তা।
এমন সংকটময় মুহূর্তে অসহায় শিশুটির পাশে দাঁড়ান কক্সবাজার আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল মন্নান। শিশুটির অসহায়ত্বের কথা শুনে তিনি এগিয়ে আসেন চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে। তাঁর উদ্যোগ ও আর্থিক সহযোগিতায় প্রায় ৪০ হাজার টাকা ব্যয়ে সম্পন্ন হয় মনিফার অস্ত্রোপচার। অর্থাভাবে থমকে যাওয়া শিশুটির চিকিৎসায় জ্বলে ওঠে নতুন আশার আলো।
১০ বছরের একটি শিশুর জীবনে যে সময়টা কাটার কথা হাসি-খেলা আর স্বপ্নে, সেই বয়সেই মনিফাকে লড়তে হয়েছে অসুস্থতা আর অসহায়ত্বের সঙ্গে। মা-বাবা, দাদা-দাদি কেউই নেই তার পৃথিবীতে। অসুস্থ শরীর নিয়ে কোথায় যাবে, কার কাছে সাহায্য চাইবে, কে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে এমন পরিস্থিতিতে শিশুটির অসহায়ত্ব আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর পেটের ব্যথা বেড়ে গেলে রাস্তার পাশে কান্নাকাটি করতে থাকে সে। আব্দুর রহিমের মানবিক উদ্যোগে হাসপাতালে পৌঁছালেও চিকিৎসার ব্যয় মেটানো ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থের অভাবে যেন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল তার সুস্থ হয়ে ওঠার পথ।
হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকদের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় অ্যাপেন্ডিসাইটিস শনাক্ত হয় বলে জানা গেছে। চিকিৎসকেরা জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন। কিন্তু চিকিৎসার খরচ বহনের সামর্থ্য না থাকায় শিশুটিকে নিয়ে উদ্বেগে পড়েন তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো আব্দুর রহিম।
শেষ পর্যন্ত তিনি সহযোগিতা চান কক্সবাজার আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল মন্নানের কাছে। শিশুটির সংকটের কথা জানার পর তিনি দ্রুত সাড়া দেন এবং চিকিৎসার ব্যয় বহনে এগিয়ে আসেন। তাঁর সহযোগিতায় প্রায় ৪০ হাজার টাকা ব্যয়ে মনিফার অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।
একদিকে মা-বাবা ও দাদা-দাদির স্নেহবঞ্চিত একটি শিশু, অন্যদিকে চিকিৎসার ব্যয় বহনে অক্ষমতা মনিফার জীবনের এই কঠিন বাস্তবতায় আব্দুর রহিম ও অ্যাডভোকেট আব্দুল মন্নানের সহযোগিতা হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন।
একজন পথচারী শিশুটিকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে মানবিক দায়িত্ব পালন করেছেন। আরেকজন মানুষের দুর্দশার কথা শুনে চিকিৎসার ব্যয়ভার বহনে এগিয়ে এসেছেন। তাঁদের এই উদ্যোগ মনে করিয়ে দেয়, রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও মানুষ মানুষের আপন হতে পারে।
তবে মনিফার অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হওয়াই তার জীবনের সব সংকটের অবসান নয়। তার পরবর্তী চিকিৎসা, নিরাপদ আশ্রয়, নিয়মিত দেখভাল ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যে শিশুটির পাশে অসুস্থতার সময়ে আপনজন ছিল না, তার সুস্থ ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন।
মনিফার গল্প তাই শুধু একটি অস্ত্রোপচারের গল্প নয়, এটি অসহায় একটি শিশুর বেঁচে থাকার লড়াই এবং মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধের এক মর্মস্পর্শী দৃষ্টান্ত।