বুধবার, ২৯শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৪ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কক্সবাজার জেলা

কক্সবাজারে ‘স্মার্ট চা-ওয়ালা’: ভিন্ন স্বাদের চায়ে বদলে গেল নোমানের ভাগ্য

কক্সবাজারের ‘স্মার্ট চা ওয়ালা’ দোকানের মালিক মোহাম্মদ নোমান

শহরজুড়ে অসংখ্য চায়ের দোকানের ভিড়ে আলাদা করে নজর কাড়ে একটি ব্যানার-‘স্মার্ট চা-ওয়ালা’। কক্সবাজারের ঝাউতলার প্রধান সড়কের পাশে কেন্দ্রীয় সমবায় সুপার মার্কেটের নিচতলায় অবস্থিত এই ছোট্ট দোকানটিই এখন পর্যটক ও স্থানীয় মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু। সকাল থেকে সন্ধ্যা-সব সময়ই ভিড় লেগে থাকে দোকানটিতে।

দোকানটি পরিচালনা করছেন মোহাম্মদ নোমান (৩৫)। শার্টের ওপর কোট, হাতে গ্লাভস আর মাথায় গেরুয়া ক্যাপ পরে চা বানানোর ধরনেই আলাদা নজর কাড়েন তিনি। তবে আসল আকর্ষণ তাঁর বানানো চায়ের স্বাদ। মাল্টা, পুদিনাপাতা, তেঁতুল, মধু-লেবু থেকে শুরু করে মসলা ও ফলের মিশ্রণে তৈরি ১২ রকমের চা পাওয়া যায় এখানে। সাধারণ চা যেখানে ১০ টাকায় মিলছে, সেখানে কাজুবাদাম চা পর্যন্ত রয়েছে ৫০ টাকায়। স্বাদ আর বৈচিত্র্যের কারণেই অল্প সময়েই শহরজুড়ে পরিচিত হয়ে উঠেছে তাঁর দোকান।

দোকানে আসা পর্যটক সাজিদ আহমেদ গাজীপুর থেকে কক্সবাজারে বেড়াতে এসেছেন। তিনি বলেন, সৈকতের আশপাশে কয়েক জায়গায় চা খেলেও এখানে এসে ভিন্ন স্বাদ পেয়েছেন। নানা ফল ও মসলার মিশ্রণে তৈরি চা তাঁর কাছে একেবারেই আলাদা লেগেছে। একই কথা বলেন রাঙ্গুনিয়া থেকে আসা পর্যটক তাজনুর বেগম। তিনি জানান, মাল্টা ও পুদিনাপাতার এমন স্বাদ আগে কখনো পাননি। তাই সৈকত এলাকা থেকে অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে বিশেষভাবে এই চা খেতে এসেছেন।

নোমানের জীবনের পথচলা সহজ ছিল না। তাঁর বাড়ি ভোলার ব্যাংকেরহাটের চররমেশ গ্রামে। সাত বছর আগে জীবিকার সন্ধানে কক্সবাজারে এসে ঝাউতলা গাড়ির মাঠ এলাকায় একটি কুলিং কর্নার চালু করেছিলেন। কিন্তু লোকসানের কারণে সেই ব্যবসা বন্ধ করে ফিরে যেতে হয় গ্রামে। পরে আবার নতুন করে সাহস সঞ্চয় করে কক্সবাজারে ফিরে আসেন তিনি। তখন ভাবতে থাকেন, পর্যটকদের পছন্দ হয়-এমন কিছু করতে হবে। কয়েক দিন শহর ঘুরে তিনি বুঝতে পারেন, পর্যটকদের আড্ডার অবিচ্ছেদ্য অংশ চা, কিন্তু সব দোকানের চা প্রায় একই রকম। সেখান থেকেই মাথায় আসে ভিন্ন স্বাদের চায়ের ধারণা। দুই লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে সমবায় মার্কেটের নিচে ছোট দোকান ভাড়া করে শুরু করেন ‘স্মার্ট চা-ওয়ালা’।

নোমান বলেন, কুলিং কর্নারের লোকসানের পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। এখন আল্লাহর রহমতে মানুষ চা খাওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ায়। সব খরচ বাদ দিয়ে মাসে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় হয়, যা দিয়ে পরিবার ভালোভাবেই চলে। এখন শহরে অনেকেই তাঁকে নামের বদলে ‘স্মার্ট চা-ওয়ালা’ বলেই চেনে।

তাঁর সংসারে মা, স্ত্রী ও ১০ বছর বয়সী এক ছেলে রয়েছে, যে মাদ্রাসার হিফজ বিভাগে পড়ে। শুধু ব্যবসাই নয়, সামাজিক বার্তাও ছড়াচ্ছেন নোমান। দোকানের পাশে টাঙানো প্ল্যাকার্ডে লেখা-‘ধূমপানকে না বলুন, সুস্থ জীবন গড়ে তুলুন’। চায়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি মাদক ও ধূমপানবিরোধী সচেতনতার কথাও বলেন ক্রেতাদের।

স্থানীয় ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন বলেন, নোমানের বানানো চা মানসিক প্রশান্তি দেয়, সারা দিনের ক্লান্তি দূর করতে প্রায়ই তিনি এখানে আসেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জেসমিন আক্তার জানান, বাইরে চা খাওয়ার অভ্যাস না থাকলেও নোমানের তেঁতুল চা তিনি নিয়মিত পান করেন।

এক সময়ের ব্যর্থ ব্যবসায়ী আজ কক্সবাজারের পরিচিত মুখ। ভিন্ন ভাবনা, সাহস আর পরিশ্রমের জোরেই নোমান প্রমাণ করেছেন-ছোট্ট এক কাপ চাও বদলে দিতে পারে জীবনের গল্প।

ক্যাটাগরি