শুক্রবার, ১১ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৭শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সারা দেশ

সপরিবারে শিক্ষক হত্যা: আসামিপক্ষে মামলা পরিচালনা করবে না আইনজীবী সমিতি

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার মামলায় আসামিদের পক্ষে আইনি লড়াই না করার ঘোষণা দিয়েছে রংপুর জেলা আইনজীবী সমিতি। একই সঙ্গে নিহত পরিবারের পাশে থেকে তাদের সব ধরনের আইনি সহায়তা দেওয়ারও ঘোষণা দিয়েছেন আইনজীবীরা।

শনিবার (২৯ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রংপুর জেলা আইনজীবী সমিতি ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান সমিতির সাধারণ সম্পাদক আফতাব উদ্দিন।

তিনি বলেন, আইনজীবী সমিতির সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্তদের পক্ষে আইনি লড়াই না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে রয়েছে আইনজীবী সমিতি এবং তাদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের আইনি লড়াইয়ে সহযোগিতা করা হবে।

গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চার সদস্যের হত্যাকাণ্ডকে নিকৃষ্টতম ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে আফতাব উদ্দিন বলেন, আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন সরকারি আইনজীবী রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসককে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

তিনি বলেন, এ ঘটনায় পুলিশ ইতোমধ্যে দুইজনকে আটক করেছে। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে লুণ্ঠিত গহনা উদ্ধার করা হয়েছে। আটক দুজন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন বলেও পুলিশ জানিয়েছে।

পুলিশের তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে আফতাব উদ্দিন বলেন, পুলিশি তৎপরতা ও সাংবাদিকদের সহযোগিতায় এখন পর্যন্ত তদন্ত ও আইনগত কার্যক্রম সঠিক পথেই এগোচ্ছে বলে তারা মনে করছেন।

তবে হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের গুজব ও মনগড়া তথ্য ছড়ানোর বিষয়ে সতর্ক করেন তিনি। তিনি বলেন, কেউ কেউ এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রচারের চেষ্টা করছেন। আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে হত্যাকাণ্ড নিয়ে রাজনীতি না করার এবং কোনো ধরনের গুজব না ছড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।

একই সঙ্গে ঘটনার প্রকৃত তথ্য অনুসন্ধান করে তা জনগণের সামনে তুলে ধরতে সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক।

যেভাবে প্রকাশ্যে আসে চার হত্যার ঘটনা

রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অবসরে যান। দীর্ঘদিন তিনি রংপুর শহরের বাংলাদেশ ব্যাংক মোড় এলাকার একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। পরে নগরীর মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকায় জমি কিনে সেখানে বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন।

জানা গেছে, জমিটি ২০১০ সালে কেনা হলেও সেখানে বাড়ি নির্মাণ শুরু হয় অনেক পরে। নির্মাণাধীন ওই বাড়ির দোতলায় প্রায় তিন বছর ধরে স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে বসবাস করছিলেন গণপতি চক্রবর্তী। বাড়িটির নিচতলার নির্মাণকাজ তখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি।

অবসরে যাওয়ার পর গণপতি চক্রবর্তী হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করতেন এবং রোগীও দেখতেন বলে জানা গেছে।

গত ২২ আগস্ট রাতে ওই বাসা থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬০), তার স্ত্রী প্রীতিলতা (৫০), স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তীর (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

একই পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ঘটনার পর হত্যাকাণ্ডের কারণ ও জড়িতদের শনাক্তে তদন্ত শুরু করে পুলিশ।

গ্রেপ্তার দুই তরুণ, আদালতে জবানবন্দি

চারজনকে হত্যার ঘটনায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে রংপুর কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।

মামলার তদন্তের ধারাবাহিকতায় ঘটনার দিন ভোরে একই এলাকা থেকে মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, তাদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে লুণ্ঠিত গহনা উদ্ধার করা হয়েছে।

পরে ওই দুই তরুণকে আদালতে হাজির করা হলে তারা ১৬৪ ধারায় হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

তবে মামলার তদন্ত এখনো চলমান থাকায় হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব আলামত ও তথ্য কতটা পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

এদিকে একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় আসামিদের পক্ষে আইনি লড়াই না করার আইনজীবী সমিতির সিদ্ধান্তকে ঘিরে রংপুরে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। আইনজীবী সমিতি জানিয়েছে, তারা বিচারপ্রক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে থাকবে এবং পরিবারটির প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা নিশ্চিত করবে।

সংবাদ সম্মেলনে রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মাহফুজ উন নবী ডন, অ্যাডভোকেট সাহেদ কামাল ইবনে খতিব, অ্যাডভোকেট কাওছার আলীসহ আইনজীবী সমিতির অন্যান্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

ক্যাটাগরি