বুধবার, ৯ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৫শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কক্সবাজার জেলা

কক্সবাজার সিটি কর্পোরেশনের প্রস্তাবিত সীমানা বাড়ছে, যুক্ত হচ্ছে পাঁচ ইউনিয়নের বড় অংশ

১৬৯.৬৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনে নতুন সিটি কর্পোরেশন; বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১০ লাখ ৮০ হাজার

কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রশাসনিক সীমানা সম্প্রসারণের একটি বিস্তারিত প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। প্রস্তাবিত সম্প্রসারিত এলাকায় কক্সবাজার সদর ও রামু উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের পুরো কিংবা নির্দিষ্ট অংশ অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে বর্তমান কক্সবাজার পৌরসভার সঙ্গে দক্ষিণ মিঠাছড়ি, খুনিয়াপালং, খুরুশকুল, পিএমখালী ইউনিয়নের পুরো এলাকা এবং ঝিলংজা ইউনিয়নের নির্দিষ্ট কিছু মৌজা নিয়ে গঠিত হবে নতুন কক্সবাজার সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসনিক সীমানা।
সম্প্রসারণের ফলে প্রস্তাবিত সিটি কর্পোরেশনের মোট আয়তন হবে প্রায় ১৬৯.৬৪ বর্গকিলোমিটার।

২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী প্রস্তাবিত এলাকাগুলোতে মোট জনসংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৮ হাজার ৭২৭ জন। তবে গত কয়েক বছরে জনসংখ্যা ও নগরায়ণ দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমানে এসব এলাকায় আনুমানিক ১০ লাখ ৮০ হাজার মানুষের বসবাস রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত প্রশাসনিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে কক্সবাজার পৌরসভার আয়তন ৩২.৯০ বর্গকিলোমিটার এবং এখানে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের বসবাস। পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান পৌর এলাকার পাশাপাশি আশপাশের ঘনবসতিপূর্ণ ও দ্রুত নগরায়িত অঞ্চলগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

যে পাঁচ ইউনিয়ন যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব
প্রস্তাবিত সীমানা অনুযায়ী রামু উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের ১৮.০০ বর্গকিলোমিটার এবং খুনিয়াপালং ইউনিয়নের ৪৭.৮২ বর্গকিলোমিটার পুরো এলাকা সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল ইউনিয়নের ২৩.৬৭ বর্গকিলোমিটার এবং পিএমখালী ইউনিয়নের ২৭.২৫ বর্গকিলোমিটার সম্পূর্ণ এলাকা নতুন সিটি কর্পোরেশনের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।

এছাড়া সদর উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ ঝিলংজা ইউনিয়নের ২০.০০ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু মৌজাকে প্রস্তাবিত সিটি কর্পোরেশনের সীমানায় অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে ঝিলংজা ইউনিয়নের পুরো এলাকা নয়, বরং নির্ধারিত মৌজাগুলোই নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ হবে।

দ্রুত নগরায়ণের বাস্তবতায় সীমানা সম্প্রসারণ
কক্সবাজার শহর ও এর আশপাশের এলাকায় গত এক দশকে ব্যাপক নগরায়ণ হয়েছে। পর্যটনকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠা, সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামো নির্মাণ এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে পৌরসভার বর্তমান সীমানার বাইরে থাকা এলাকাগুলোও ক্রমেই শহরের সঙ্গে একীভূত হচ্ছে। বিশেষ করে খুরুশকুল, পিএমখালী, ঝিলংজা, দক্ষিণ মিঠাছড়ি ও খুনিয়াপালংয়ের বিভিন্ন এলাকায় আবাসন, সড়ক যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য নগরসুবিধা সম্প্রসারিত হয়েছে। এর ফলে এসব এলাকার সঙ্গে কক্সবাজার শহরের অর্থনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগও আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।

প্রশাসনিক প্রতিবেদনে এই বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে বৃহত্তর নগর এলাকার জন্য একটি সমন্বিত প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

বর্তমান পৌরসভা থেকে বড় পরিসরের নগর প্রশাসন
বর্তমান কক্সবাজার পৌরসভার আয়তন ৩২.৯০ বর্গকিলোমিটার হলেও প্রস্তাবিত সিটি কর্পোরেশনের আয়তন হবে ১৬৯.৬৪ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ প্রশাসনিক সীমানা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে নগর ব্যবস্থাপনার আওতাও বিস্তৃত হবে।

প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে নতুন সিটি কর্পোরেশনের আওতায় সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি সরবরাহ, ড্রেনেজ, জলাবদ্ধতা নিরসন, নগর পরিকল্পনা, সড়কবাতি, স্বাস্থ্যসেবা, নাগরিক সেবা ও অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রমকে বৃহত্তর পরিসরে সমন্বয় করার সুযোগ তৈরি হবে। তবে নতুন সীমানার আওতায় আসা বিশাল এলাকার নাগরিকদের জন্য পর্যাপ্ত নগরসেবা নিশ্চিত করাও হবে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে দ্রুত বর্ধনশীল আবাসিক এলাকা, পাহাড়ি ও উপকূলীয় অঞ্চল, খাল-নদী ও জলাধার সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহারের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজন হবে।

প্রায় ১১ লাখ মানুষের নগর প্রশাসনের নতুন বাস্তবতা
প্রশাসনিক নথিতে উল্লেখ করা বর্তমান আনুমানিক জনসংখ্যা অনুযায়ী প্রস্তাবিত সিটি কর্পোরেশন এলাকায় প্রায় ১০ লাখ ৮০ হাজার মানুষ বসবাস করছেন। পর্যটন মৌসুমে কক্সবাজারে অস্থায়ীভাবে মানুষের সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। ফলে স্থায়ী জনসংখ্যার পাশাপাশি পর্যটক ও ভাসমান জনগোষ্ঠীর চাপও নগর ব্যবস্থাপনায় বিবেচনায় নিতে হবে। সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত হলে কক্সবাজার শুধু একটি পৌরসভা হিসেবে নয়, বরং বৃহত্তর একটি নগর প্রশাসন হিসেবে পরিচালিত হওয়ার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে পর্যটননির্ভর অর্থনীতি, পরিবেশগত ভারসাম্য, নাগরিক সুবিধা ও ভবিষ্যৎ নগর সম্প্রসারণকে সমন্বয় করে পরিকল্পনা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

সহকারী প্রকৌশলী রোমেল বড়ুয়া, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আদনান চৌধুরী এবং প্রশাসক মো. শামীম আল ইমরানের স্বাক্ষর সম্বলিত সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথিতে প্রস্তাবিত সম্প্রসারিত এলাকা, আয়তন ও জনসংখ্যার এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত সীমানা বাস্তবায়ন এবং কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার প্রক্রিয়া শেষ হলে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন নগরী কক্সবাজারের নগর ব্যবস্থাপনায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

ক্যাটাগরি