সদর উপজেলা

কলাতলীতে বাতিল প্লট ঘিরে ‘কোটি টাকার বাণিজ্য’, নির্মাণ হচ্ছে মার্কেট

উঁচু টিনের বেড়ার আড়ালে চলছে নির্মাণকাজ; দোকান বরাদ্দে মোটা অঙ্কের ‘সালামি’র অভিযোগ; তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস প্রশাসনের

কক্সবাজারের পর্যটন এলাকার গুরুত্বপূর্ণ কলাতলী মোড়। ব্যস্ত এই এলাকার একটি সরকারি প্লট ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্ন। স্থানীয়দের অভিযোগ, বরাদ্দ বাতিল এবং উচ্চ আদালতের স্থিতাবস্থার আদেশ থাকার পরও প্লটটিতে গোপনে নির্মাণ করা হচ্ছে মার্কেট। নির্মাণাধীন দোকানগুলো আগেভাগেই মোটা অঙ্কের ‘সালামি’র বিনিময়ে বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

প্রশ্ন উঠেছে- আদালতের স্থিতাবস্থার আদেশ থাকলে সেখানে নির্মাণকাজ চলছে কীভাবে? কারা করছেন এই নির্মাণ? প্রশাসনের নজর এড়িয়ে পর্যটন এলাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এত বড় নির্মাণকাজই বা কীভাবে এগিয়ে যাচ্ছে?

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণস্থলের চারপাশ উঁচু টিন দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। বাইরে থেকে ভেতরের কার্যক্রম সহজে দেখা যায় না। টিনের বেড়ার আড়ালে কয়েকজন শ্রমিককে নির্মাণকাজ করতে দেখা গেছে।

কিন্তু কার নির্দেশে এই নির্মাণ- এ প্রশ্নের উত্তর মেলেনি শ্রমিকদের কাছে। কথা বললে তারা জানান, মালিক বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিষয়ে তাদের কিছু জানা নেই। তারা শুধু কাজ করছেন।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রাসাদ প্যারাডাইসের মালিক ইউসুফ আবদুল্লার নামে বরাদ্দ থাকা বি.এস. খতিয়ান নং-০১-এর ৩০ নম্বর প্লটটি নিয়ে আদালতে মামলা চলমান। প্লটটিতে স্থিতাবস্থার আদেশও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি।

শুধু নির্মাণ নয়, নির্মাণাধীন দোকান ঘিরে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, একটি সিন্ডিকেট নির্মাণকাজ পরিচালনার পাশাপাশি দোকানগুলো বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে মোটা অঙ্কের ‘সালামি’র বিনিময়ে বরাদ্দ দিচ্ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দোকান বরাদ্দকে কেন্দ্র করে কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে। তবে কার কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হয়েছে বা কার নামে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে—এ সংক্রান্ত কোনো নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয়দের দাবি, এই প্লটে নির্মাণকাজ এবারই প্রথম নয়। এর আগেও আদালতের আদেশ উপেক্ষা করে কয়েকটি হোটেলসহ প্রায় ২০ থেকে ২৫টি দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। সেসব দোকানও ‘সালামি’র বিনিময়ে ভাড়া বা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে, প্লটটি সরকারি এবং বরাদ্দ বাতিল হয়ে থাকলে সেখানে আগে নির্মিত স্থাপনাগুলোর বৈধতা কী? এসব স্থাপনার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নিয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

স্থানীয়দের কেউ কেউ আরও অভিযোগ করেছেন, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার এবং প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে নির্মাণকাজ চালানো হচ্ছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং কোনো কর্মকর্তার সম্পৃক্ততাও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

প্লটটির দায়িত্বে থাকা কামরুলের সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। ফোনে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি সরাসরি দেখা করে বক্তব্য দেওয়ার কথা জানান। পরে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

কক্সবাজার সদর উপজেলা ভূমি কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মশিউর রহমান বলেন, ‘বাতিলকৃত সরকারি প্লট হলে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করব। বিষয়টি জানতাম না। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যতই প্রভাবশালী হোক, সরকারি জায়গা দখল করতে দেওয়া হবে না।’

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক (ডিসি) আ. মান্নানও জানান, বিষয়টি তার জানা ছিল না। অভিযোগের বিষয়ে দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

তবে প্রশাসনের এই বক্তব্যের পরও কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি, প্লটটির বর্তমান আইনগত অবস্থান কী, আদালতের স্থিতাবস্থার আদেশের পরিধি কতটুকু, নির্মাণের অনুমোদন কে দিয়েছে এবং নির্মাণাধীন দোকান বরাদ্দের নামে সত্যিই অর্থ লেনদেন হয়ে থাকলে সেই অর্থ কার কাছে যাচ্ছে?

ক্যাটাগরি