সোমবার, ১৪ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ৩০শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কক্সবাজার জেলা

আরাকান আর্মির এক বছরে জেলেধরা, সীমান্ত পেরিয়ে দেড় লাখ নতুন রোহিঙ্গা

ফাইল ছবি

মিয়ানমারের রাখাইনে আরাকান আর্মির উত্থান ও দখল প্রসারের এক বছর পেরিয়ে গেলেও সীমান্তজুড়ে স্থিতিশীলতার বদলে অস্থিরতাই যেন নতুন বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।  ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর গণমাধ্যমে প্রথম প্রকাশিত খবরটিতে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ সংলগ্ন ২৭১ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে আরাকান আর্মি (এএ)।  আজ, সেই সময়সীমা অতিক্রমের পরও পরিস্থিতি আর ততটা বদলানোর কোনো ইঙ্গিত নেই, বরং সংঘাতের রেখাচিত্র আরও গাঢ় হয়েছে, মানবিক বিপর্যয়ের বিস্তারও ততটাই বেড়েছে।

রাখাইন রাজ্যের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে এএ দাবি করছে অন্তত ১৪টি টাউনশিপ তাদের দখলে। কিন্তু বাস্তবচিত্র অন্য কথা বলে। জান্তার পাল্টা আক্রমণে এএ-নিয়ন্ত্রিত কয়েকটি অঞ্চল এখন পুনরায় নড়বড়ে অবস্থায়; বিশেষ করে কৌশলগত তিনটি টাউনশিপ এখনো তাদের নাগালের বাইরে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও এএ- উভয় পক্ষই দখল ও প্রতিদখলের চক্রে জড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের জন্য রক্ষাকবচ নেই, আছে কেবল আতঙ্কের আবহ।

এই অস্থিরতার সবচেয়ে তীব্র অভিঘাত পড়েছে সীমান্তের দুই পারে। নাফ নদী যা একসময় জেলেদের জীবিকা ছিল, এখন হয়ে উঠেছে আতঙ্কের জলরাশি। গত এক বছরে প্রায় চার শতাধিক জেলেকে নাফ থেকে তুলে নিয়ে গেছে ইউনাইটেড লিগস অব আরাকান-এএ এরই সশস্ত্র শাখা। টেকনাফের জেলেপল্লীগুলোতে এখন “জেলেধরা বাহিনী” নামটি আতঙ্কের সমার্থক। প্রায় দুই শতাধিক জেলে এখনো মিয়ানমারের ভেতরে বন্দী-তাদের পরিবারের কাছে নেই নিশ্চিত কোনো খবর, নেই মুক্তির নিশ্চয়তা।

একইসঙ্গে, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন নতুন পর্বে পৌঁছেছে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সংঘাতের জেরে নতুন করে আরও দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। রাখাইনকে দ্রুত রোহিঙ্গাশূন্য করার লক্ষ্যে সংঘবদ্ধ অভিযান চলছে, এমন ইঙ্গিতই দিচ্ছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার বিবৃতি। বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে মানবিক দায়িত্ব পালন করছে, এখন নতুন স্রোত সামলাতে চরম চাপের মুখে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে যেসব কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বছরের পর বছর চালু আছে, সেগুলোর মাঝেও আশার আলো নেই। আন্তর্জাতিক স্তরে নানান মত-পার্থক্য, মিয়ানমারের জান্তার অনমনীয়তা এবং আরাকান আর্মির বিস্তার, সব মিলিয়ে একটি টেকসই সমাধানের সম্ভাবনা আরও দূরবর্তী হয়ে গেছে। এদিকে সংঘাতের আগুনে পুড়ছে সাধারণ রাখাইন, রোহিঙ্গা, মারমা, ম্রোসহ অন্যান্য নৃগোষ্ঠী; তাদের দিন কাটছে অনিশ্চয়তা ও ক্ষুধার ভেতর।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, রাখাইন শান্তির মুখ দেখবে কি? পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সংঘাতের বর্তমান ধারা ও কৌশলগত অবস্থান বিবেচনায় আগামী দিনগুলোতেও সহিংসতার ধারা অব্যাহত থাকার আশঙ্কাই বেশি। রাখাইনে যে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক খেলা চলছে, তাতে মানবিক অবস্থা ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা যেন সবচেয়ে কম গুরুত্ব পাচ্ছে।

সীমান্তে বন্দুকের গর্জন থামে না, নাফের স্রোতে ভেসে আসে নতুন আতঙ্ক, আর আশ্রয়শিবিরে বাড়ে ভিড়, এমন বাস্তবতার মাঝেই সময় যেন কেবল অপেক্ষা করছে নতুন কোনো দুঃসংবাদ কিংবা আরও একটি মানবিক বিপর্যয়ের দিকে।

 

ক্যাটাগরি