গুম থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়: সালাহউদ্দিন আহমদের জীবন, সংগ্রাম ও প্রত্যাবর্তনের গল্প
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে উত্থান-পতন, সংকট-সংগ্রাম আর নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের বহু গল্প আছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি নিঃসন্দেহে সালাহউদ্দিন আহমদকে ঘিরে। এক সময় যাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নিয়ে গিয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল, দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার পর যাঁর সন্ধান মিলেছিল ভারতের শিলংয়ে, আজ তিনিই দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। যে মন্ত্রণালয়ের অধীনেই পরিচালিত হয় পুলিশ, র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
২০১৫ সালে নিখোঁজ, সীমান্ত পেরিয়ে শিলং
২০১৫ সালের ১০ মার্চ ঢাকার উত্তরা এলাকা থেকে সালাহউদ্দিন আহমদকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ করে তাঁর পরিবার। সে সময় তিনি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে সক্রিয় রাজনীতিতে ছিলেন। হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। পরিবার, দল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো দাবি তোলে তাকে ‘গুম’ করা হয়েছে।
দুই মাসেরও বেশি সময় কোনো খোঁজ না মেলায় নানা গুঞ্জন ছড়ায়। অনেকেই আশঙ্কা করেন, হয়তো তিনি আর বেঁচে নেই। কিন্তু মে মাসে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে তাঁকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে স্থানীয় পুলিশ। পরে তিনি চিকিৎসাধীন হন। কীভাবে সীমান্ত পেরিয়ে সেখানে পৌঁছালেন, তা নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক চলে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে তিনি দেশে ফেরেন এবং আবার সক্রিয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাই তাঁর রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে বড় মোড়। কারণ, নিখোঁজ থেকে ফিরে আসার পর তিনি দলের অভ্যন্তরে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান লাভ করেন।
প্রশাসনিক ক্যারিয়ার থেকে রাজনীতির ময়দান
সালাহউদ্দিন আহমদ কেবল রাজনীতিক নন, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর। সপ্তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৮৮ সালে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। ১৯৯১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তবে স্থিতিশীল সরকারি চাকরি ছেড়ে ১৯৯৬ সালে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর উত্তরণ ছিল দ্রুত ও দৃঢ়।
সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হিসেবে উত্থান
মাত্র ৩৪ বছর বয়সে ১৯৯৬ সালে কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। তরুণ বয়সেই জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করে আলোচনায় আসেন।
২০০১ সালে বিএনপি জোট সরকার ক্ষমতায় এলে ৪১ বছর বয়সে যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি সেই দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর কক্সবাজার জেলা থেকে প্রথমবারের মতো মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কৃতিত্বও তাঁর।
এরপর দীর্ঘ রাজনৈতিক বিরতি, আন্দোলন-সংগ্রাম ও গুমের ঘটনাপ্রবাহ পেরিয়ে আবারও তিনি নির্বাচনে অংশ নেন। এবারসহ চতুর্থবারের মতো কক্সবাজার-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে পূর্ণ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। প্রায় ২০ বছর পর জেলা থেকে প্রথম পূর্ণ মন্ত্রী হওয়ার ইতিহাস গড়েন তিনি।
দলে অবস্থান ও নেতৃত্ব
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক থেকে শুরু করে কাউন্সিলের মাধ্যমে টানা দুইবার কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন সালাহউদ্দিন আহমদ। ২০১০ সালের জাতীয় কাউন্সিলে তিনি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন।
সবশেষ জাতীয় কাউন্সিলে যখন তিনি ভারতে অবস্থান করছিলেন তাকে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম, স্থায়ী কমিটির সদস্য নির্বাচিত করা হয়। এটি দলের ভেতরে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ও প্রভাবের প্রতিফলন বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।
পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবন
১৯৬২ সালের ৩০ জুন পেকুয়া ইউনিয়নের সিকদার পাড়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মৌলভী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পিতা মৌলভী ছাঈদুল হক ও মাতা আয়েশা হকের সন্তান সালাহউদ্দিন আহমদ চার সন্তানের জনক।
তার স্ত্রী অ্যাডভোকেট হাসিনা আহমদও রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং ২০০৮ সালে চকরিয়া-পেকুয়া আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ফলে রাজনীতি তাদের পারিবারিক পরিমণ্ডলেও গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে।
গুমের শিকার থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সবচেয়ে আলোচিত দিকটি হলো- যে সময় তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নিয়েছিল বলে অভিযোগ, সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে আজ তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। এই মন্ত্রণালয়ই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করে।
অনেকে মনে করছেন, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাকে মানবাধিকার, জবাবদিহিতা ও আইনের শাসন বিষয়ে আরও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে। আবার সমালোচকরা বলছেন, চ্যালেঞ্জও কম নয়, কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সন্ত্রাস দমন, সীমান্ত নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বড় দায়িত্ব।
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে সালাহউদ্দিন আহমদের সামনে রয়েছে বহু চ্যালেঞ্জ। গুম-সংক্রান্ত অভিযোগ, মানবাধিকার ইস্যু, পুলিশ সংস্কার, সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম সবই এখন তাঁর মন্ত্রণালয়ের আওতায়।
রাজনৈতিক জীবনের ঝড়ঝাপটা, গুমের অভিযোগ, নির্বাসন-সদৃশ সময় পার করে আবার রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরে আসা-এই পুরো যাত্রা তাঁকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অনন্য চরিত্রে পরিণত করেছে।
ইতিহাসের নির্মম অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়া সালাহউদ্দিন আহমদের এই অধ্যায় এখন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, বরং বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক ইতিহাসেরও এক তাৎপর্যপূর্ণ অংশ।