৪০ ভরি স্বর্ণ ছিনতাইয়ের অভিযোগ, কনস্টেবলসহ দুইজন গ্রেফতার
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রায় ৮০ লাখ টাকা মূল্যের ৪০ ভরি স্বর্ণ ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগে পুলিশ কনস্টেবল জাকির হোসেনসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলার পর কনস্টেবল জাকিরসহ দুইজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এসময় উদ্ধার করা হয়েছে ছিনিয়ে নেওয়া স্বর্ণের সাড়ে ২০ ভরি। বাকি স্বর্ণ উদ্ধারে অভিযান চলছে।
শনিবার গভীর রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানায় মামলাটি করেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী নিঝুম। মামলায় কনস্টেবল জাকির হোসেনকে এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়েছে। এছাড়া আরও দুইজনের নাম উল্লেখ এবং একজন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
মামলা দায়েরের পর রাতেই এজাহারভুক্ত আসামি কনস্টেবল জাকির হোসেন এবং বাদীর দুলাভাই মোহাম্মদ আলীকে গ্রেফতার করা হয়। মোহাম্মদ আলীর বাড়ি থেকেই রাতে সাড়ে ২০ ভরি স্বর্ণ উদ্ধার করে পুলিশ। জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) এ এন এম ওয়াসিম ফিরোজ এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে, গত ৭ সেপ্টেম্বর ‘৪০ ভরি স্বর্ণ গায়েব করলেন পুলিশ কনস্টেবল’ শিরোনামে বাংলাদেশ প্রতিদিনে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে নড়েচড়ে বসেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশের মুখপাত্র এ এন এম ওয়াসিম ফিরোজ জানান, প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে পুলিশ কনস্টেবল জাকির হোসেনসহ দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। রবিবার দুপুরে তাদের আদালতে তোলা হবে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা প্রয়োজন মনে করলে আসামিদের রিমান্ডের আবেদন করবেন বলেও জানান তিনি।
কনস্টেবল জাকির হোসেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর পুলিশ ফাঁড়ির অফিসার্স মেসে কর্মরত ছিলেন। তার বাড়ি রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার শ্যামপুর গ্রামে। গত ৮ আগস্ট বেলা ৩টার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার কালীনগর ব্রিজের পাশে স্বর্ণ ছিনতাইয়ের ঘটনাটি ঘটে।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গলিত অবস্থায় থাকা ৪০ ভরি স্বর্ণ রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক ব্যবসায়ীর কাছে পাঠিয়েছিলেন ব্যবসায়ী নিঝুম। স্বর্ণের চালানটি রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে নিয়ে যান নিঝুমের দুলাভাই মোহাম্মদ আলী। তার বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের চকআলমপুরে।
পুলিশ কনস্টেবল জাকির হোসেন মোহাম্মদ আলীর ছেলে মো. নয়নের বন্ধু। মোহাম্মদ আলী চাঁপাইনবাবগঞ্জের ওই ব্যবসায়ীর কাছে স্বর্ণের চালানটি পৌঁছে দেওয়ার প্রায় দুই মিনিটের মধ্যে কনস্টেবল জাকিরসহ দুইজন সেখানে হাজির হন। পরে পুলিশ পরিচয়ে তারা ওই স্বর্ণ নিয়ে চলে যান বলে অভিযোগ।
এরপর এক মাসের ছুটি নিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে যান কনস্টেবল জাকির হোসেন। ছুটি শেষে কয়েকদিন আগে তিনি কর্মস্থলে যোগ দেন। পরে তাকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়। মামলা হওয়ার পর পুলিশ লাইনস থেকেই তাকে গ্রেফতার করা হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গ্রেফতার মোহাম্মদ আলী পুলিশকে ২০ ভরি স্বর্ণ দেওয়ার সময় জানিয়েছেন- বাকি ২০ ভরি স্বর্ণ রয়েছে কনস্টেবল জাকির হোসেনের কাছে। স্বর্ণের চালানটি নেওয়ার বিষয়টি তিনিই জাকিরকে জানিয়েছিলেন বলেও পুলিশকে জানিয়েছেন মোহাম্মদ আলী।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্বর্ণ হস্তান্তরের পর জাকির অভিযানের কথা বলে ওই স্বর্ণ নিয়ে যান। পরে ৪০ ভরি স্বর্ণ তারা ভাগাভাগি করে নেন বলেও মোহাম্মদ আলী জানিয়েছেন। তবে কনস্টেবল জাকির হোসেন এখন পর্যন্ত ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেননি। তার হেফাজতে থাকা বলে উল্লেখ করা বাকি ২০ ভরি স্বর্ণও তিনি পুলিশকে দেননি।
ঘটনার দিন সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে কনস্টেবল জাকির হোসেনসহ দুইজনকে তার ব্যবহৃত অ্যাপাচি মোটরসাইকেল নিয়ে কালীনগর ব্রিজের দিকে যেতে দেখা যায় বলে জানা গেছে। এছাড়া ঘটনার দিন, আগের দিন এবং পরদিন মোহাম্মদ আলী ও তার ছেলে নয়নের সঙ্গে জাকিরের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার দুই দিন আগে ৬ আগস্ট জাকির তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর থেকে নয়নের নম্বরে ১০ বার কথা বলেন। ঘটনার আগের দিন ৭ আগস্ট একই নম্বরে ২৫ বার এবং মোহাম্মদ আলীর নম্বরে সাতবার কথা বলেন তিনি। ঘটনার দিন ৮ আগস্ট জাকির ও নয়নের মধ্যে ১০ বার ফোনে কথা হয়। একই দিন নয়নের বাবা মোহাম্মদ আলীর সঙ্গেও জাকিরের ১১ বার কথা হয়েছে। তবে স্বর্ণ ছিনতাইয়ের পরদিন নয়ন কিংবা তার বাবা মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে জাকিরের আর কোনো কথা হয়নি।
স্বর্ণ ছিনতাইয়ের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর কনস্টেবল জাকির হোসেনকে প্রত্যাহার করার পাশাপাশি জেলা পুলিশের সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইয়াসির আরাফাতকে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাকে ১০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল।
এর মধ্যেই ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মামলা করলে কনস্টেবল জাকিরসহ দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়। উদ্ধার করা হয় ছিনিয়ে নেওয়া স্বর্ণের অর্ধেকের বেশি। বাকি স্বর্ণ উদ্ধারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) এ এন এম ওয়াসিম ফিরোজ রবিবার সকালে জানান, কনস্টেবল জাকির হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করার চিঠিও প্রস্তুত করা হয়েছে। পুলিশ সুপার আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় থাকায় তিনি ফিরে আসার পর সাময়িক বরখাস্তের আদেশে স্বাক্ষর করবেন।
তিনি আরও জানান, মোহাম্মদ আলী তার কাছে থাকা স্বর্ণ বের করে দিলেও কনস্টেবল জাকির হোসেন এখনো বাকি স্বর্ণ দেননি। ওই স্বর্ণ উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ।