২৪ বছরেও উন্নয়নের ছোঁয়া নেই পেকুয়ার পশ্চিম নন্দীরপাড়া স্টেশন সড়কে
খানাখন্দে বেহাল জনপথ, যান চলাচল প্রায় বন্ধ—দুর্ভোগে শিক্ষার্থীসহ হাজারো মানুষ
কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের পশ্চিম নন্দীরপাড়া স্টেশন সড়কটি দীর্ঘ ২৪ বছরেও পায়নি কোনো দৃশ্যমান উন্নয়নের ছোঁয়া। প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ গুরুত্বপূর্ণ এই গ্রামীণ সড়ক এখন খানাখন্দ, বড় বড় গর্ত ও উঠে যাওয়া ইটে পরিণত হয়েছে। বর্ষায় সড়কটি কাদায় একাকার হয়ে পড়ায় যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি হেঁটে চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সংস্কারের দাবি জানানো হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে সড়কটি এখন শুধু যোগাযোগের সংকটই নয়, স্থানীয় মানুষের শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার জন্যও বড় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সদর ইউনিয়নের পশ্চিম নন্দীরপাড়া স্টেশন থেকে নন্দীরপাড়া চৌমুহনী স্টেশন পর্যন্ত সড়কটির দৈর্ঘ্য প্রায় এক কিলোমিটার। ২০০২ সালে তৎকালীন যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সড়কটিতে ইট বিছিয়ে উন্নয়ন করেছিলেন। এরপর প্রায় দুই যুগ পেরিয়ে গেলেও সড়কটির আর কোনো দৃশ্যমান সংস্কার বা টেকসই উন্নয়ন হয়নি।
দীর্ঘদিনের অবহেলায় সড়কের ইট উঠে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোথাও ইটের অস্তিত্বও খুঁজে পাওয়া কঠিন। স্থানীয়দের ভাষায়, একসময়কার ইটের সড়কটি এখন দেখতে অনেকটা কাঁচা সড়কের মতো।
শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ
সড়কটি স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও শিক্ষক-কর্মচারীদের যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিন অন্তত ৫ থেকে ৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শত শত শিক্ষার্থী এই সড়ক ব্যবহার করে।
পেকুয়া উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও নন্দীরপাড়ার বাসিন্দা অ্যাডভোকেট জাহেদ হাসান বলেন, “আমাদের এই সড়কটি অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন শত শত মানুষ ও শিক্ষার্থী এই সড়ক দিয়ে চলাচল করে। গত দুই যুগ ধরে সড়কটির কোনো দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়নি। বর্ষা মৌসুমে এটি একেবারেই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।”
তিনি জানান, সড়কটির টেকসই উন্নয়নের দাবিতে এলাকাবাসীর পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবর লিখিত আবেদন করা হয়েছে। তাঁর দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত উদ্যোগ নিলে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মানুষ মুক্তি পেতে পারে।
শুধু স্থানীয় যোগাযোগ নয়, বিকল্প আঞ্চলিক পথও
সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড তাঁতীদলের সাধারণ সম্পাদক দিদারুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, এই এলাকায় প্রায় ৬ হাজার মানুষের বসবাস। নন্দীরপাড়া চৌমুহনী স্টেশন হয়ে পশ্চিম নন্দীরপাড়া স্টেশন, পৌরসভার পূর্ব ভাঙাসুরা, মইয়াদিয়া, বটতলীয়াপাড়া হয়ে মগনামা ও উজানটিয়া ইউনিয়নে যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম সড়কটি।
এ পথ ব্যবহার করে তুলনামূলক দ্রুত চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলাতেও যাতায়াত করা যায়। ফলে সড়কটির গুরুত্ব শুধু একটি গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; আশপাশের কয়েকটি এলাকার মানুষের যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ।
গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও বাজারে যাওয়ার প্রধান পথ
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বড় কবরস্থান, মেহেরনামা উচ্চ বিদ্যালয়, বাঘগুজারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আলমাছিয়া দাখিল মাদরাসা, মাজেদা খাতুন মহিলা মাদরাসা, মাজেদা খাতুন মহিলা হেফজখানা এবং বাঘগুজারা বাজারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যেতে এই সড়ক ব্যবহার করা হয়।
সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে রোগী পরিবহন, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত এবং ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহনেও সমস্যা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
গর্তে ভরা সড়ক, ঝুঁকি নিয়ে চলাচল
স্থানীয় ব্যবসায়ী নওশেদ হাসান ও কামাল হোসেন বলেন, “সড়কটি একসময় ইট বিছানো ছিল। এখন দেখতে অনেকটা কাঁচা সড়কের মতো। ইট উঠে গেছে, সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত। প্রতিদিনের দুর্ভোগ যেন আমাদের নিত্যসঙ্গী।”
তাদের অভিযোগ, বর্ষার সময় গর্তগুলো পানি ও কাদায় পূর্ণ হয়ে যায়। এতে কোন অংশ কতটা গভীর তা বোঝা যায় না। ফলে পথচারী ও ছোট যানবাহন চালকদের দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়।
ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় দীর্ঘদিনের অবহেলা
সদর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য আবু ছালেক বলেন, “আমাদের এলাকাটি ঘনবসতিপূর্ণ। সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে বেহাল অবস্থায় পড়ে থাকলেও উন্নয়নের জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি। সড়কটির কারণে এলাকার মানুষ চরম কষ্টে রয়েছে।”
স্থানীয়দের প্রশ্ন—প্রায় ৬ হাজার মানুষের বসবাস এবং একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সঙ্গে সংযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন সড়কটি দুই যুগ ধরে উন্নয়নবঞ্চিত থাকবে?
টেকসই সংস্কারের দাবি
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সাময়িকভাবে ইট বা খোয়া ফেলে গর্ত ভরাট করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বর্ষা এলেই আবার সড়কটি আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই প্রয়োজন পরিকল্পিত ও টেকসই সংস্কার—যাতে দীর্ঘদিনের জন্য নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যোগাযোগ নিশ্চিত হয়।
এলাকাবাসীর দাবি, পশ্চিম নন্দীরপাড়া স্টেশন থেকে নন্দীরপাড়া চৌমুহনী স্টেশন পর্যন্ত সড়কটির দ্রুত সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ করা হোক। পাশাপাশি সড়কটির স্থায়ী উন্নয়ন ও সংস্কারের মাধ্যমে শিক্ষার্থী, রোগী, ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘব করা হোক।
দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে সংস্কার না হওয়া এই সড়কটি এখন স্থানীয়দের কাছে শুধু একটি যোগাযোগপথ নয়, বরং উন্নয়নবঞ্চনার দৃশ্যমান প্রতীক। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত উদ্যোগই পারে সড়কটি ঘিরে তৈরি হওয়া দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটাতে।