সংস্কারের অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ শাহপরীর দ্বীপের ৫৫০ মিটার জেটি, দুর্ঘটনার শঙ্কা
দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপে নাফ নদীর তীরে নির্মিত ৫৫০ মিটার দীর্ঘ জেটিটি এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। জেটির রেলিংসহ মূল কাঠামোর বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়েছে। জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে বিশ্রামাগার ও শৌচাগারও। প্রতিদিন স্থানীয় বাসিন্দা, জেলে ও পর্যটকেরা ঝুঁকিপূর্ণ এই জেটি ব্যবহার করায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, সেন্টমার্টিনগামী পর্যটকদের যাতায়াত, স্থানীয় জেলেদের নৌযান চলাচল এবং পশু করিডোরের সুবিধা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালে ২ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে জেটিটি নির্মাণ করা হয়। ৫৫০ মিটার দীর্ঘ এ জেটিতে পর্যটক ও যাত্রীদের সুবিধার জন্য বিশ্রামাগার, শৌচাগার, চারটি সিঁড়ি এবং গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।
নির্মাণের পর ২০০৪ সালে জেটিটি জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে ২০০৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে জনসাধারণের চলাচলের জন্য এটি উন্মুক্ত করা হয়। কিন্তু উদ্বোধনের পর প্রায় দুই দশক পেরিয়ে গেলেও জেটিটিতে বড় ধরনের কোনো সংস্কারকাজ হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাঠামোর বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বর্তমানে এটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জেটির মূল কাঠামোর বিভিন্ন অংশ ভেঙে নদীতে পড়ে রয়েছে। কোথাও রেলিং নেই, আবার কোথাও কাঠামোর অংশ বিশেষ ভাঙা অবস্থায় ঝুলে আছে। বিশ্রামাগার ও শৌচাগারও দীর্ঘদিনের অব্যবহারে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। এমন বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যেই প্রতিদিন পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের জেটি দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
জেটির মুখে কোস্টগার্ড ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিজিবি সদস্য জানান, দুর্ঘটনার ঝুঁকি বিবেচনায় জেটিতে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে জেটিতে অতিরিক্ত ভিড় না করার জন্য পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
জেটির বর্তমান দুরবস্থার পেছনে নাফ নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের অভিযোগ, সাবরাং ট্যুরিজম পার্কের জমি ভরাটের জন্য ‘মেসার্স চায়না হারবাল’ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ড্রেজার দিয়ে নাফ নদী থেকে নির্বিচারে বালু উত্তোলন করেছে। এতে জেটির পিলারের চারপাশের মাটি সরে গেছে। ফলে কোথাও কাঠামো দেবে যাচ্ছে, আবার কোথাও পিলারের স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের কারণে শুধু জেটিই নয়, শাহপরীর দ্বীপের বিভিন্ন অংশও ভাঙনঝুঁকিতে পড়েছে। জেটির পিলারের চারপাশের মাটি সরে যাওয়ায় কাঠামোর ওপর চাপ বেড়েছে এবং ধীরে ধীরে বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়ছে।
অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা জেটিটি ইজারা দিয়ে নিয়মিত টোল আদায় করা হচ্ছে। ইজারাদারের প্রতিনিধি মো. ইউনুস জানান, বছরে সাড়ে ১৭ লাখ টাকায় জেটিটি ইজারা নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে জেটি ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ১০ টাকা এবং প্রতিটি মোটরসাইকেলের জন্য ৫০ টাকা হারে টোল আদায় করা হয়। তাঁর দাবি, প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা টোল আদায় হয়।
সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবদুস সালাম বলেন, জেটিতে প্রতিদিন পর্যটকদের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষেরও ব্যাপক যাতায়াত রয়েছে। এছাড়া ৪০ থেকে ৫০টি পরিবার প্রতিদিন জেটিতে বড়শি দিয়ে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে। জেটিটি ধসে পড়লে শুধু যোগাযোগব্যবস্থা নয়, শাহপরীর দ্বীপের মানুষের জীবন-জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, জরাজীর্ণ জেটিটি দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ চলাচল করছেন। বর্তমানে যেভাবে বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটার আগেই জেটিটির সংস্কার করা প্রয়োজন।
টেকনাফ উপজেলা প্রকৌশলী আলা উদ্দিন খাঁন বলেন, জেটিটি নির্মাণের পর জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। ফলে জেটিটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তাদের। তবে বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে এলজিইডির পক্ষ থেকে সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়েছে। সংস্কারের জন্য প্রকল্প পরিচালকের দপ্তরে প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছে। দ্রুত অনুমোদন পাওয়া যাবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
কক্সবাজার জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন বলেন, জেটি সংস্কারের বিষয়ে এলজিইডিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে একটি প্রতিনিধি দল জেটিটি পরিদর্শন করেছে। সংস্কারকাজে কী পরিমাণ ব্যয় হবে তা নির্ধারণের পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, শাহপরীর দ্বীপের ঝুঁকিপূর্ণ জেটিটির বিষয়ে জেলা পরিষদকে অবহিত করা হয়েছে। জননিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুততম সময়ে সংস্কারকাজ শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত সংস্কার করা না হলে জেটির ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে পর্যটন মৌসুমে মানুষের চাপ বাড়লে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়বে। তাই শুধু সাময়িকভাবে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ না রেখে জেটিটির পুরো কাঠামোগত নিরাপত্তা পরীক্ষা, ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত মেরামত এবং নাফ নদীতে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।